December 13, 2018

addnavunder

হজরত মুহাম্মদ (সা.) এক মহামানব

হজরত মুহাম্মদ (সা.) এক মহামানব

মো. মোশারফ হোসাইন:

হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে আজ ১২ রবিউল আউয়াল বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) (৫৭০-৬৩২) এর জন্মদিন এবং একই সাথে ওফাত দিবস। মানবতার এই মুক্তির দূত নিয়ে আজ কিছু বলতে চাই। আমার ধর্মীয় জ্ঞান খুবই অল্প, বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কিছু বলতে চাই।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন বিশ্বমানবের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম রাষ্ট্রনায়ক। মানবজাতির শিক্ষক এই মহামানবের রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পর্যালোচনার আগে তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ও অত্যন্ত সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। হেরাগুহায় তাঁর ধ্যানমগ্নতা, তারপর বাস্তবতার জগতে তাঁর প্রত্যাবর্তন, এক কথায়, পরমার্থিকতা এবং যুক্তির তথা আধ্যাত্মিকতা এবং কর্মনিষ্ঠার সুষ্ঠু সমন্বয়- এই হলো এক দিকে যেমন তার জীবনের সৌন্দর্য, তেমনি ইসলামের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবদান। মরমিবাদ দিয়ে যার শুরু, রাষ্ট্রের মধ্যে তার পরিপূর্ণতা। এই তো মানবজীবনের সারবত্তা। এই সারবত্তার মূর্ত রূপ হলেন আদর্শ মানব হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবন। এক অর্থে, এ তো এক পরশমণি। এর স্পর্শে সব কিছুই স্বর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব যে অসাধারণ তাতে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না।

প্রকাশনায় কাজ করার সময় সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মানবীয় গুণাবলী লিখতে গিয়ে তাঁর হাজার হাজার গুণাবলীর মধ্যে নিচের কয়েকটি গুণ লিখেছিলাম। আজ এইগুলো পুনরায় বলার চেষ্টা করি।

নিরহংকার : মক্কার শ্রেষ্ঠ বংশে মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু বংশগৌরবজনিত অহংকার তাঁর মনে মুহূর্তের জন্যেও স্থান পায়নি।

আল-আমীন বা বিশ্বাসী : আমৃত্যু মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সবার নিকট আল-আমীন বা বিশ্বাসী। তাঁর চরিত্রগৌরব, জ্ঞান-গরিমা, ন্যায়নিষ্ঠা, সত্যপরায়ণতা ইত্যাদি দেখে মানুষ তাঁকে নির্ভয়ে বিশ্বাস করত।

অকুতোভয় বীর : মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অকুতোভয় বীর। শত্রুর নিষ্ঠুরতম নির্যাতনেও তিনি ভীত হননি। সত্যে তিনি ছিলেন বজ্রের মত কঠিন, পর্বতের মত অটল, পাথরের মত শক্ত।

কুসুম কোমল : দয়া-মায়া, স্নেহ-করুণায় মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন কুসুমের মত কোমল। বৈরীর অত্যাচারে তিনি জর্জরিত হয়েছেন, শত্রুর আক্রমণে বহুবার রক্তে রঞ্জিত হয়েছেন। তথাপি তিনি পাপী মানুষকে ভালবেসেছেন। তাদেরকে তিনি কখনো অভিশাপ দেননি।

ক্ষমাশীলতা : ক্ষমাশীলতায় মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অনন্য। মক্কার পথে প্রান্তরে তিনি শত্রু কর্তৃক আহত হয়েছেন, ব্যঙ্গ বিদ্রুপে বার বার উপদ্রুত হয়েছেন; কিন্তু তিনি দু’হাত তুলে তাদের জন্য প্রার্থনা করেছেন, “এদের জ্ঞান দাও প্রভু, এদের ক্ষমা কর।”

সুমহান মহানুভবতা : মুহাম্মদ (সা.) মহানুভবতা অতুলনীয়। মক্কা বিজয়ের পর সুযোগ পেয়েও তিনি কারো প্রতি কোন প্রকারের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। বরং ঘোষণা করেছেন, “ভাইসব, তোমাদের সম্বন্ধে আমার আর কোন অভিযোগ নাই, আজ তোমরা সবাই স্বাধীন, সবাই মুক্ত।”

আল্লাহর আজ্ঞাবহ : আজীবন মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রতিটি আদেশ-নিষেধ মেনে চলেছেন। আল্লাহর প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিল ইস্পাতের মতো কঠিন। শত অত্যাচারেও তিনি সত্য প্রচারে ক্ষান্ত হননি।

ওপরে বর্ণিত গুণাবলী ছাড়াও মুহাম্মদ (সা.) আরো হাজার হাজার মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন, যা লিখে শেষ করা যাবে না।

লেখক মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী তাঁর মানব মুকুট বইয়ের প্রস্তাবনায় লিখেছেন : ‘যে সমস্ত মহাপুরুষের আবির্ভাবে এই পাপ-পঙ্কিল পৃথিবী ধন্য হইয়াছে, যাঁহাদিগের প্রেমের অমৃত সেচনে দুঃখতপ্ত মানবচিত্ত স্নিগ্ধ হইয়াছে, যাঁহারা মানবসমাজের যুগ-যুগান্তরের কুক্ষিগত কালিমা রশ্মির মধ্য হইতে সূর্যের ন্যায় উত্থিত হইয়া পাপের কুহক ভাঙ্গিয়াছেন, ধর্মের নবীন কিরণ জ্বালাইয়াছেন ও পতিত মানবকে সত্য ও প্রেমে সঞ্জীবিত করিয়া নবীন জীবনপথে টানিয়া লইয়া গিয়াছেন, ইসলাম ধর্মের প্রচারক হজরত মুহাম্মদ সা: তাঁহাদের অন্যতম।’

সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্রিটেনের খ্যাতনামা দার্শনিক জন লক (John Lock) যে তত্ত্বের ভিত্তিতে বলেছিলেন- ‘সেই রাষ্ট্রই সর্বশ্রেষ্ঠ যা শাসিতদের সম্মতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে’। সেই তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ ঘটে মদিনায় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে এবং এই অনবদ্য সৃষ্টির মূলে ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম মনীষী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। এই নগরীতে প্রতিষ্ঠিত হয় মহানবীর নেতৃত্বে মসজিদে নববী। এই মসজিদই ছিল গণতান্ত্রিক মদিনা রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্তৃত্বের প্রাণকেন্দ্র। আইন প্রণয়নের কেন্দ্রবিন্দু এবং ন্যায়নীতির শীর্ষস্থান ও বিচার বিভাগের শীর্ষস্থান।

মক্কার একদল অভিশপ্ত মানুষদের অত্যাচারে হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাধের জন্মভূমি পরিত্যাগ করে যখন ইয়াসরিবে (বর্তমান মদিনায়) পা রাখলেন, ইয়াসরিবের জনগণ তাঁকে অভূতপূর্ব পরিবেশে অত্যন্ত আবেগঘন আবহে স্বাগত জানালেন। ইয়াসরিব নগরীর চাবি তাঁর হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে শুধু প্রিয়তম ব্যক্তিরূপে আপন করে নিলেন তা-ই নয়; এই নগরীর পরিচালনার সব দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দিয়ে তাঁর নেতৃত্ব অবনত মস্তকে স্বীকার করে নিলেন। এই স্বীকৃতির প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইয়াসরিবের জনগণ তাদের প্রিয় নগরীর নামকরণ করলেন ‘মদিনাতুন্নবী’ অথবা ‘মদিনাতুর রাসূল’। দিনটি ১২ রবিউল আউয়াল। খ্রিষ্টীয় ৬২২ অব্দের ২২ অথবা ২৪ সেপ্টেম্বর। একটি লিখিত সংবিধানের মাধ্যমে (মদিনা চার্টার) বিশ্বের এই অংশে প্রতিষ্ঠিত হলো জনগণের সম্মতিভিত্তিক, কল্যাণমুখী ও গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সৃষ্টি হলো অনবদ্য এক দৃষ্টান্ত সব ধরনের স্বৈরাচারমুক্ত। ব্যক্তি প্রভাবের ঊর্ধ্বে। প্রভুত্ববাদকে অস্বীকার করে সম্পূর্ণরূপে জনগণের সম্মতিভিত্তিক, চুক্তির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মদিনা রাষ্ট্রের জন্ম হলো।

মদিনা রাষ্ট্র বিশ্বময় মাথা তুলে স্থিতিশীলতার আশীর্বাদ নিয়ে সমৃদ্ধি ও শান্তিপূর্ণ অবস্থার সম্পদকে মূলধন করে বিশ্বজয়ী হয়ে ওঠে সেই মদিনা রাষ্ট্র। অথচ সপ্তম শতাব্দীতে রাষ্ট্র গঠনের আগে মদিনার অবস্থা ছিল অনেকটা নৈরাজ্যপূর্ণ। ওই সময় মদিনায় ছিল সুসংগঠিত আদি পৌত্তলিক সম্প্রদায়। ছিল দেশী ও বিদেশী ইহুদি জনগোষ্ঠী। তার পরে আসেন মক্কা থেকে হিজরত করে নব্য মুসলিমরা। প্রত্যেক ইতিহাসবিদ এ কথা অত্যন্ত জোরে প্রচার করেছেন যে, তখনকার আরব সমাজ ছিল গোত্র-গোষ্ঠীতে খণ্ডছিন্ন, শতধাবিভক্ত ও ওইসব গোত্র-গোষ্ঠী-উপজাতি সব সময় লিপ্ত ছিল পারস্পরিক দ্বন্দ্বে, হিংসা-বিদ্বেষ, অসূয়াতাড়িত প্রতিহিংসার জিঘাংসায়। সমাজে ছিল না কোনো ঐক্যবোধ, ছিল না সহানুভূতি অথবা সহযোগিতার কোনো সূত্র। সংক্ষেপে প্রাক-ইসলাম আরবে সমাজজীবনে ‘নিঃসঙ্গ, দীন, কদর্য, পশুতুল্য এবং স্বল্পায়ু’ (Solitary, Poor, nasty, brutis and short) মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হজরত মুহাম্মদ (সা.) সৃজনশীল নেতৃত্বে এবং সীমাহীন আন্তরিকতার সেই খণ্ডছিন্ন শতধাবিভক্ত সমাজজীবনের অফুরন্ত কল্যাণকামী প্রবাহের সৃষ্টি হয়ে তা পরে ৭০০ বছর ধরে স্থায়ী হয়ে বিশ্বের চিন্তাভাবনাকে আলোকিত করে রাখে। সৃষ্টি করে নতুন নতুন সৃষ্টির প্রাণ, যা অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি।

মদিনা রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল মদিনা সনদ-৫৩ অনুচ্ছেদ সম্মিলিত লিখিত সংবিধান। এর ভূমিকায় সনদকে চিহ্নিত করা হয়েছিল ‘কিতাব’ রূপে এবং আধুনিক অর্থে সংবিধান। সনদের ২৩, ৪০, ৪৬ ও ৫১ অনুচ্ছেদে সনদকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘সহিফা’ হিসেবে এবং আধুনিক অর্থে তাও হলো সংবিধান। প্রকৃত প্রস্তাবে মদিনা সনদ ছিল একটি সংবিধান এবং মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটাই হলো সর্বপ্রথম লিখিত পূর্ণাঙ্গ সংবিধান। পাশ্চাত্যের প্রচারণায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে অজ্ঞতায় এবং মুসলিম পণ্ডিতদের উদাসীনতার ফলে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের ছাত্রছাত্রীরা জানে, আমেরিকার সংবিধানই সমগ্র বিশ্বে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ১৭৮৯ সালের প্রায় এক হাজার ১৫০ বছর আগেই রচিত হয়েছে মদিনা সনদ। মদিনা রাষ্ট্র শুধু মুসলমানদের রাষ্ট্র নয়, নয় কুরাইশদের অথবা মুহাজির বা আনসারদের। এই রাষ্ট্র সব ধর্ম ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার। মুসলমান ও ইহুদির। আদি পৌত্তলিক ও অমুসলিমদের। যে যার ধর্ম অনুসরণ করবে কিন্তু জাতি হিসেবে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে সবাই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; এর প্রতিরক্ষায় সবাই কৃতসঙ্কল্প। জাতীয়তার প্রকৃতি বিশ্লেষণকারী হাজারো তাত্ত্বিক আজ পর্যন্ত যেসব জটিল ক্ষেত্রে কোনো সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হননি, বিভ্রান্তির চোরাবালিতে পথ হারিয়েছেন, সে ক্ষেত্রে মদিনা সনদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম রাষ্ট্রনায়কের নেতৃত্বে কিভাবে সহজ ও সরল পথে পথপরিক্রমা শুরু করেছিল তা আজো সবাই বিস্ময়াভিভূত হয়ে পর্যালোচনা করে থাকেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) রাজনীতিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় এক রাষ্ট্রনায়ক, শ্রেষ্ঠতম প্রজ্ঞায় বিভূষিত একজন জননেতা। যদি তিনি চাইতেন তিনি হতে পারতেন পরম পরাক্রমশালী সম্রাট। হতে পারতেন প্রবল প্রতাপান্বিত বাদশাহ। মহামহিম সুলতান। আর তখনকার বিশ্বে এটিই ছিল নিয়ম। সূচনা করতে পারতেন রোমান সম্রাটদের অথবা পারস্য সম্রাটের মতো অথবা চীনের রাজাধিরাজের মতো, মিসরের ফেরাউনদের মতো সূচনা করতে পারতেন এক পারিবারিক ধারা (Dynastic line)। কিন্তু নবী করিম সাঃ ছিলেন দুনিয়ার এইসব ক্ষমতা লিপ্সা, ভোগ-বিলাস, যশ, প্রতিপত্তির উর্দ্ধে। তাকে কখনো এসব দুনিয়াবী ব্যাপার আকৃষ্ট করেনি। রাজনীতিকেরা সবসময় বর্তমানকালেই বসবাস করেন। তাদের দৃষ্টি থাকে ক্ষমতার দিকে এবং ক্ষমতাপ্রসূত সুযোগ-সুবিধা অথবা বৈভব-প্রভাবের দিকে। দৃষ্টি থাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে অথবা পারিবারিক পর্যায়ে বিলাসিতার দিকে। আল্লাহর রাসূল হজরত মুহাম্মদ সা: ছিলেন একজন রাষ্ট্রনায়ক (Statesman), বর্তমানে বসবাস করেও তিনি দৃষ্টি রেখেছিলেন মানবজাতির ভবিষ্যতের দিকে ও তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে। মানবজাতির ঐক্য ও সংহতির দিকেই তিনি দৃষ্টি রেখেছিলেন। দৃষ্টি দিয়েছিলেন তাদের পরিপূর্ণ জীবনের দিকে, তাদের ইহলোক ও পরলোকের সম্পূর্ণতার দিকে।

 

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বি.এসসি. (অনার্স), এম.এস. (মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এম. এসসি. (পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

addnavunder

Related posts

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Headerbaner