মে দিবস: সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মতামত

মোঃ মোশারফ হোসাইন:

পহেলা মে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হয়। ১৮৮৬ সালের মে মাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক আন্দোলন ও সংগ্রামের পুণ্যস্মৃতির সম্মানে এই দিনটি পালিত হয়।

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কৃষি ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা শিল্পায়নের দিকে এগোতে শুরু করলে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিস্ময়কর পরিবর্তন আসে। এ পরিবর্তনই ‘শিল্প বিপ্লব’ নামে পরিচিত। মানবসভ্যতার ইতিহাসে তিনটি শিল্প বিপ্লবে বিরাট পরিবর্তন হয়েছে মানব জাতির জীবনযাত্রা প্রণালীতে। ১৭৮৪ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন তৈরি এবং ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের জীবনে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
১৭৮৪ সালে বাষ্প ইঞ্জিন আবিস্কারের ফলে সকল পণ্য উৎপাদনে পেশি শক্তির পরিবর্তে যান্ত্রিক শক্তি তথা মেশিনারিজের ব্যবহার শুরু হয়। ইউরোপ আমেরিকা জুড়ে হাজার হাজার শিল্প কারখানা স্থাপন হয়, বেড়ে যায় শ্রমিকদের চাহিদা। কথিত Slavery Rule এর আলোকে সাদা চামড়ারা অনেক আগে থেকেই কালো চামড়াদের জন্তুর মতো ঘাটাত। শিল্প বিপ্লবের পর এই ধারা একটু ভিন্ন ভাবে বিকশিত হয়, ফলশ্রুতিতে সাদাদের একটা অংশ নির্যাতনের শিকার হতে থাকে। মূলত এই চেতনা থেকেই শুরু হয় শ্রমিক আন্দোলন। কেননা শ্রমিকদের একটা বড় অংশ এলিটদের দ্বারা নির্যাতিত হতে থাকে এবং বঞ্চিত হতে থাকে তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এ অবস্থা ছিল আরো খারাপের দিকে যায়। তখন শ্রমিকরা দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করলেও তার বিনিময়ে সামান্য মজুরিও পেতেন না। উপরন্তু ছিল মালিকপক্ষের অনবরত অকথ্য নির্যাতন। ১৮৬০ সালে শ্রমিকরা তাঁদের মজুরি না কমিয়ে সারা দিনে আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের জন্য দাবি জানান। এ জন্য তাঁরা একটি সংগঠনও তৈরি করেন পরবর্তীকালে, যার নাম হয় আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার। এই সংগঠন শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অবিরত আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে।

১৮৮৪ সালে সংগঠনটি দিনে কাজের সময় ‘আট ঘণ্টা’ নির্ধারণের জন্য মালিকপক্ষের কাছে সময় বেঁধে দেয়। সময় দেওয়া হয় ১৮৮৬ সালের ১ মে পর্যন্ত। বারবার মালিকপক্ষের কাছে দাবি জানানো হলেও একটুও সাড়া মেলে না তাঁদের কাছে। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এ বিষয়ে এক আলোড়ন তোলা আর্টিকেল। ব্যস, বিদ্রোহ ওঠে চরমে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহর হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-বিদ্রোহের মূলমঞ্চ।

পহেলা মে যতই এগিয়ে আসছিল, দুই পক্ষের সংঘর্ষ অবধারিত হয়ে উঠছিল। মালিক-বণিক শ্রেণি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। এরই মধ্যে পুলিশ আগে তাঁদের এপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল, আবারও চলল তেমনই প্রস্তুতি। শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে পুলিশদের বিশেষ অস্ত্র কিনে দেন ব্যবসায়ীরা। পহেলা মেতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন লাখ শ্রমিক কাজ ফেলে নেমে আসেন রাস্তায়। আন্দোলন চরমে ওঠে। ৩ মে, ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা শিকাগোর হে মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় জড়ো হওয়া শ্রমিকদের দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিছু পুলিশ সদস্য। এমন সময় হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণে কিছু পুলিশ আহত হন, পরে মারা যান ছয়জন। পরে পুলিশও শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ চালালে নিহত হন ১১ জন শ্রমিক। পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের হত্যামামলায় অভিযুক্ত করে ছয়জনকে প্রহসনমূলকভাবে দোষী সাব্যস্ত করে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়। কিন্তু এই মিথ্যা বিচারের অপরাধ শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে। ২৬ জুন ১৮৯৩ ইলিনয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিথ্যে ছিল ওই বিচার। পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ’-এর দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। সেই থেকে পহেলা মে পালিত হয় শ্রমিকদের আত্মদান আর দাবি আদায়ের দিন হিসেবে।

আলোচনার শুরুতে প্রথম ও দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের কথা বলেছি, তৃতীয় ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা না বললে ক্যামনে হয়, যদিও এটা যে দিবসের আলোচনার সাথে সম্পর্কিত না। তারপরও কয়েকটি বাক্যে বলি…১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট আবিষ্কার হওয়ার ফলে কায়িক শ্রমের বিপরীতে মস্তিষ্কপ্রসূত জ্ঞানের বিপ্লব ঘটে গেছে এবং শিল্পোৎপাদনের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়েছে। এই তিন বিপ্লবের যত অর্জন, তার সবকিছু পেছনে ফেলে এখন এসে গেল ডিজিটাল বিপ্লব বা চতুর্থ বিপ্লব ( এপ্রিল ৫, ২০১৯ দক্ষিণ কোরিয়াতে 5G প্রযুক্তি চালুর মধ্যে দিয়ে এর সূচনা হয়)। এর সবচেয়ে বড় উপাদান হতে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং তথ্যপ্রযুক্তির যাবতীয় অনুষঙ্গ। প্রতিটি ক্ষেত্রে রোবোটিক্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার মানবজাতির জন্য বিপুল কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপপ্রয়োগ বা অপব্যবহার হলে তা মানবজাতির জন্য অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে, এমন আশঙ্কা আছে। কিন্তু সেটা তো খোদ বিজ্ঞান নিয়েও আছে। বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব আবিষ্কার পারমাণবিক বোমার মজুদের কারণে বিশ্ব একটি মহা বিপন্ন অবস্থায় ঝুলে আছে। তা বলে বিজ্ঞানের চর্চা বন্ধ করে দেয়ার কোনো যুক্তি নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই।

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বি.এসসি. (অনার্স), এম.এস. (মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এম. এসসি. (পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *