মৃত্তিকা দূষণ: বাংলাদেশের এক বিপদের নাম

মতামত

মো. মোশারফ হোসাইন:

মৃত্তিকা বা মাটি (Soil) হলো ভূত্বকের (Earth Crust) উপরি ভাগের একটা পাতলা আবরণ। এর বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে কোনো এলাকার কৃষি ব্যবস্থা। বাংলাদেশের মাটি স্তরে স্তরে (Soil Layer) গঠিত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেগুলি অবলয়িত (Azonal) বৈশিষ্ট্যের। প্রতি বছর বন্যার ফলে মাটিতে নতুন নতুন পলি-স্তর (Sediment) সঞ্চিত হতে থাকে, আবার পুরানো স্তরগুলির বিন্যাসের (Structure) বৈশিষ্ট্যে ও পরিবর্তন বা রূপান্তর আসে। ইদানিং ব্যবস্থাপনার অভাবে বাংলাদেশে মৃত্তিকা দূষণ (Soil Pollution) একটি গুরুতর বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞদের মতে ক্রমাগত রাসায়নিক ব্যবহার, জমিতে উপর্যুপরি চাষ, খরা, লবণাক্ততা, কীট নাশক ব্যবহার, কলখারখানার বর্জ্য, ভাটায় ইট পোড়ানোয় দূষিত হচ্ছে মাটি। এছাড়া আর্সেনিক দূষণ ও পারমাণবিক বিস্ফোরণে ও মাটি দীর্ঘ সময়ের জন্য দূষিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে। এসব দূষণে কমে যাচ্ছে ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা, বিপর্যয় হচ্ছে পরিবেশের। শুধু তাই নয়, মাটি দূষিত হলে মাটির স্বাভাবিক গঠন ভেঙ্গে যায়। ফলে মাটিতে বেড়ে যায় মারাত্মক রোগ ব্যাধির প্রবণতা। মৃত্তিকা দূষণের আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে ভূমি ক্ষয় যা মাটির গুণ গত পরিবর্তন ঘটায় এবং বন্ধনকে (Soil Particle Bond) দুর্বল করে। এছাড়া বৃক্ষ, মাটির উপরের ঘাস ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ আবরণ (যামা টিকে নির্দিষ্ট জায়গায় ধরে রাখে) সেগুলি অপসারিত বা ধ্বংস হলে মৃত্তিকা ক্ষয়ের প্রক্রিয়াত্বরান্বিত হয় এবং বায়ু প্রবাহ ও বৃষ্টির পানিতে মাটি দ্রুত ক্ষয় প্রাপ্ত হতে থাকে। বন্যার ফলে ও মাটি স্থানান্তরিত হয়, এতে মাটির গঠনের গুণগত পরিবর্তন দেখা দেয়। এসব কারণে ভারসাম্যহীন হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন (Agricultural production)। প্রতি বছর জন সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্য দিকে আবাদি জমি অনাবাদি খাতে হ্রাস পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জন সংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে এ স্বল্প আবাদি জমি থেকেই। কৃষির এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে গিয়ে এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি উন্নত জাতের ফসল আবাদ করতে গিয়ে ও জমির ওপর চাপ পড়ছে। সে কারণে জমির উৎপাদন ক্ষমতা চিন্তা করে জমিকে বিশ্রাম দেয়া প্রয়োজন। তাছাড়া শস্য পর্যায় (Crop Period) অবলম্বন করা হয় না, এতে মাটির উর্বরতা কমে যায়। আর মাটির উর্বরতা কমে গেলে মাটির ভূপ্রকৃতি বা পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। মাটিতে উদ্ভিদ জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকলে মাটির স্বাস্থ্য ভাল বলা হয়। মাটিতে অপরিকল্পিত ভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে এমন পদার্থের নিঃসরণসহ অসমহারে সার প্রয়োগ, কীটনাশক প্রয়োগ করা হলে মাটির স্বাস্থ্য খারাপ হবে এবং ফলন কম হবে।

এসবের একটা সহজ সমাধান হল মাটিতে জৈব পদার্থ (Organic Matter) যোগ। Pedologist দের মতে মাটিতে স্থিতিশীল উচ্চ স্তরের জৈব পদার্থ প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক জৈবিক উপকারিতা প্রদান করে। জৈব পদার্থ (Organic Matter) মাটি জগতের জন্য খাদ্য উৎস হিসেবে কাজ করে এবং মাটি এর মাইক্রোবাইল বৈচিত্র্য বাড়িয়ে দেয় এবং রোগ ও কীটনাশক দমন করতে সহায়তা করে। জৈব পদার্থগতভাবে পানি পরিস্রাবণ এবং ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মাটি উন্নত করে, মাটির তলদেশে মৃত্তিকাগুলির সঙ্গে কাজ করে মাটির তীব্রতা বৃদ্ধিকে সহজ করে তোলে।
জৈব পদার্থ মৃত্তিকার শক্তির বিকাশ এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, মৃত্তিকার খনিজ পদার্থের পচাকে গতি বাড়ায় এবং pH পরিবর্তনের বিরুদ্ধে মাটির বীজ বজায় রাখে। স্বাভাবিক বাস্তু তন্ত্রের মধ্যে জৈব পদার্থ ক্রমাগত পুনর্ব্যবহৃত হয় যেমন প্রাণী ও উদ্ভিদ অবশিষ্টাংশ ছেড়ে যায় বা মরে যায় এবং এ উপকরণগুলি ভাঙ্গা হয়।

বারবার মনে রাখতে হবে যে, যে সব কারণে মাটি অস্বাস্থ্যবান হতে পারে তা হচ্ছে- অনুমোবদনহীন রাসায়নিক সার ব্যবহার করা, বিধি-নির্দেশ বহির্ভূত চুন ব্যবহার করা, শস্য চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি, জৈব সার ব্যবহার না করা বাব্যবহার কম করা, সুষম সার ব্যবহার না করা, কৃষি জমি শোধন না করা, বীজ শোধন না করে বপন, সঠিক পদ্ধতি ও পরিমিত পরিমাণে সেচ না দেয়া, কৃষি জমিতে শিল্প বর্জ্য নিঃসরণ করা, অপরিকল্পিতভাবে বালাই নাশক ব্যবহার করা, অপরিকল্পিতভাবে ভূমি চাষ, অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটা, সর্বোপরি ফসলের চাহিদা মতো পুষ্টির জোগান না দেয়া।

মাটি স্বাস্থ্যহীন হলে মাটির উর্বরতা (Soil Fertility) ও উৎপাদন ক্ষমতা (Soil Productivity) কমে যায়, মাটি ও পানি দূষণ হয়, পুষ্টি উপাদানের বিষাক্ততা দেখা দেয়, মাটিতে ক্ষতি কর ভারী ধাতব পদার্থের (Heavy metal) আধিক্য হতে পারে। এর ফলে ফসলে অপুষ্টিজনিত (Deficiency Symptoms) লক্ষণ দেখা দেয়, কৃষি ফসলের ফলন ও উৎপাদন কমে যায় এবং ফসলের গুণগত মান কমে যায়। এছাড়া ফসলের ক্ষতি কর কীটপতঙ্গের আক্রমণ বেশি হতে পারে, ফসল রোগাক্রান্ত হয় ও মোট দেশজ কৃষি উৎপাদন কমে যায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সুষম করার জন্য মাটির স্বাস্থ্য (Soil Health) ভালো রেখে সীমিত জমি থেকে অধিক ফসল উৎপাদন করা হয়ে থাকে। ক্রমাগত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ওষুধ ব্যবহারের দরুন দেশের নদী নালা ও জলাশয়ে মাছসহ নানা জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, মানুষসহ উদ্ভিদের ওপর ও এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের মতে, ইদানীং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটিতে ব্যাপক হারে পুষ্টি উপাদানের যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে তার প্রকৃত কারণ রাসায়নিক সার ও কীট নাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। মান সম্পন্ন মাটিতে ৪.০ শতাংশের বেশি জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন এবং এর সর্ব নিম্ন হতে পারে ২.৫ শতাংশ। কিন্তু ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার ওঅ ন্যান্য কীট নাশক ব্যবহারের কারণে দেশে বিভিন্ন এলাকার বেশির ভাগ ফসলি জমির জৈব পদার্থ কমে দাঁড়িয়েছে ১.০ শতাংশের নিচে।

এমনকি বহু জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ০.৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। বিশেষত অব্যাহত দূষণের কারণে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার মাটি বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। শিল্প কারখানার বর্জ্য, পলিথিন, ট্যানারিরবর্জ্য, প্লাস্টিক, রাবার, সিসা, কাচ, ই-বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্য, ধাতব পদার্থ নির্গতের কারণে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। ঢাকার মাটি দূষণের ফলে শহরবাসীর ওপর মারাত্মক ক্ষতি কর প্রভাব পড়ছে। শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, রক্ত শূন্যতা, উচ্চ রক্তচাপ, কলেরা, টাইফয়েড, ক্ষুধা মন্দাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের মত অনুসারে, মাটির ক্ষয় রোগ থেকে উদ্ধার প্রাপ্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে জমিতে নিয়মিত জৈব সার প্রয়োগ। মাটিতে জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করতে হলে ধইঞ্চা চাষ করা দরকার, যা ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা ও উর্বরতা বাড়াতে বেশ কার্যকর।

কৃষি ব্যবস্থাপনার বহু আবর্জনা যেমন ফসলের পরিত্যক্ত মূল, লতাপাতা, কা- ও অন্যান্য অংশ, গবাদি পশুর মলমূত্র, অকেজো কৃষি যন্ত্রাংশ পচে-গলেমাটিতে মিশে যায়। ফসলের জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করায় মাটি দূষিত হচ্ছে। শিল্প কারখানার বর্জ্যসহ বিভিন্ন বর্জ্য মাটি দূষিত করছে। প্রতি বছর দেশে প্রায় ১৬-২০ হাজার টন কীট নাশক ব্যবহৃত হয়। আর এ কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে প্রায় ৭ লাখ লোক। এদের মধ্যে মারা যাচ্ছে ১৪-১৫ হাজার। এতে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিনষ্ট হচ্ছে। ভূমি ক্ষয় ও জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস পাচ্ছে, যা মাটির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। বাংলাদেশে শুধু পোকা মাকড় দ্বারাই বছরে প্রায় ১০-১৫ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে, যার মূল্য আনুমানিক ২ হাজার কোটি টাকা। উপকূলীয় অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে ১০ লাখ হেক্টরের ও অধিক জমি বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। ১৯৭৩ সালের জরিপে যেখানে লবণাক্ত মৃত্তিকার পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২০ হাজার হেক্টরে। লবণাক্ততা বাড়ার পরিমাণ ২৫.৫ শতাংশ। মৃত্তিকা বিজ্ঞানীদের মতে, ফারাক্কার কারণে উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এসব অঞ্চলের মাটিতেল বণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। বাঁধের অভ্যন্তরে সুইস গেট রক্ষণা বেক্ষণের অবস্থার সঙ্গে ভূগর্ভস্থল বণ পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মাটি বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ এসব মাটি চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

যশোর, নড়াইল, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরের কিছু জৈব মাটির বিল অঞ্চলে বর্তমানে ফসল উৎপাদন একেবারে সীমিত হয়ে পড়েছে। দেশী ও উফশী রোপা আমন ছাড়া আর কিছুই চাষ হচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দ্রুত সমন্বিত ব্যবস্থায় শস্য নিবিড়তা না বাড়ানো হলে অচিরেই এসব এলাকার পুরো জমির লবণাক্ত তার হার বেড়ে যাবে এবং এখানে আর কোনো দিনই সবুজ শস্য জন্মাবে না। মাটিতে ব্যাকটেরিয়া জাতীয় অণুজীবের সংখ্যা আরো বেশি। এক হিসাব মতে, উর্বর কৃষি জমির ২ কোটির বেশি ব্যাকটেরিয়া, ৫০ হাজার শৈবাল, ৪ লাখ ছত্রাক এবং ৩০ হাজার প্রেটোজোয়া থাকতে পারে। মাটিতে পর্যাপ্ত কেঁচো থাকলে হেক্টরপ্রতি ১০০ কেজি নাইট্রোজেন প্রতি বছর আবর্তিত হয়। এতে মাটির ভৌত অবস্থায় উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। ১৮৫টি জীবাণুই মাটির সঙ্গে সম্পর্কিত। মাটি শোধনের পূর্বেই জমিতে সার প্রয়োগ করা দরকার। প্রতিগ্রাম মাটিতে অন্তত ১ কোটি নাইট্রোজেন সংযোজনকারী ব্যাকটেরিয়া থাকা মাটির জন্য উপকারী। দূষিত মাটিতে পোকামাকড়, অণুজীব ভালো জন্মাতে পারে না।

এতে মাটির বাস্তুতন্ত্রে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য উর্বরউৎপাদনশীল মাটি খুবই প্রয়োজন। বেশি করে গাছ পালা লাগালে মাটি দূষণরোধ হবে। কীটনাশক ও রাসায়নিক সার পরিমিত পরিমাণ ব্যবহারে মাটি বহুলাংশে দূষণ মুক্ত রাখা সম্ভব। কল-কারখানা ও আবাসিক এলাকার বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সর্বোপরি মাটি দূষণের বিরুদ্ধে সরকারকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক: বি. এসসি. (অনার্স); এম. এস. (মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ), ঢাবি; এম. এসসি. (পানি সম্পদ উন্নয়ন), বুয়েট।
সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (৩৬তম বিসিএস এ সুপারিশকৃত)।

Spread the love

1 thought on “মৃত্তিকা দূষণ: বাংলাদেশের এক বিপদের নাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *