মুগল শাসক আকবর: মুসলিম নামে কুলাঙ্গার না সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাহক?

মতামত

মো. মোশারফ হোসাইন:

মুগল সম্রাট জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) ছিলেন একজন বিজয়ী বীর, দক্ষ প্রশাসক ও শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। তাঁর কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য সমসাময়িক বিখ্যাত অন্যান্য শাসকদের মধ্যে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন তিনি। পিতা হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুর পর মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে মুগল সিংহাসনে আরোহণ করেন।ইতিহাসখ্যাত এই সম্রাট ভারতবর্ষ শাসন করেছিলেন প্রায় ৫০ বছর।

সিংহাসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরই তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারে প্রবৃত্ত হন। ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর সময় বিশাল মুগল সাম্রাজ্য কাবুল থেকে বাংলা এবং হিমালয় থেকে আহমেদনগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আকবর উপমহাদেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব, উত্তর-পশ্চিম এবং দাক্ষিণাত্যে মুগল সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটান। বর্তমানে প্রচলিত ইতিহাসের কিছু বইয়ে এবং প্রচারিত মিডিয়ায় তাকে স্মরণ করা হয় The Great (মহামতি) আকবর হিসেবে এবং আরেক দলের কাছে মুসলিম নামে কুলাঙ্গার (Black Ship)। আজকের আলোচনার বিষয় এটাই, চেষ্টা করব নির্মোহ বিশ্লেষন করতে‌।

উপমহাদেশে মুগল রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সম্রাট বাবর। পরে ক্ষমতায় আসে তার পুত্র হূমায়ুন। হুমায়ুন কিছুদিনের জন্য আফগান শুরীদের নিকট রাজ্য হারিয়ে পরাশ্রিত ছিলেন। পরে বিখ্যাত সেনাপতি বৈরাম খা এর কৌশলে ও বীরত্ত্বে হুমায়ুন দিল্লীর দরবার পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়। মোগল সাম্রাজ্য পুনর্দখলের মূল কারিগর হলেন বৈরাম খা (১৫০১-১৫৬১)। মুগল ইতিহাসে এই সেনাপতির মহানুভবতা অপরিসীম। তিনি ছিলেন মুগল সম্রাট হুমায়ুনের প্রধান সেনাপতি, উপদেষ্টা এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও শ্রদ্ধেয় সভাসদ। হূমায়ুন তাকে খান ই খানান-বৈরাম খান (রাজাধিরাজ বা রাজাদের রাজা) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ঐতিহাসিক গ্রন্থ জওহর আবতাচির থেকে জানা যায়, বৈরাম খাঁ’র প্রকৃত নাম ছিল বৈরাম বেগ। হুমায়ুনের মৃত্যুর পরে নাবালক সম্রাট আকবরের মূল অভিভাবক ছিলেন বৈরাম খা।আকবর লেখাপড়া কিছুই জানত না।

বৈরাম খা-ই পরামর্শ দিয়ে আকবর-কে সামনে রেখে রাজ্য চালাতেন। কোন কোন ইতিহাসবিদরা তাকে হিন্দুস্থানের মুকুটহীন বাদশাহ বলে অভিহিত করেন। আকবর তাকে খান বাবা বলে সম্বোধন করতেন। আকবরের সিংহাসন আরোহণের পরপরই আগ্রা ও দিল্লি আদিল শাহ শূরের সেনাপতি হিমুর অধিকারে চলে যায়। রাজা বিক্রমজিৎ উপাধি গ্রহণ করার পর মুগলদের একেবারে শেষ করতে অগ্রসর হন। নিষ্পত্তিমূলক পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে হিমু আহত ও বন্দি হন এবং পরবর্তীকালে নিহত হন। আগ্রা ও দিল্লি দখলের মাধ্যমে মুগল শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠিতা ঘটে। বৈরাম খা ইচ্ছে করলেই নাবালক আকবর কে হত্যা কড়ে সরিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেন নাই। বছর খানেক পরে মত-বিরোধের কারনে সম্রাট আকবর তাকে মক্কায় পাঠিয়ে দেন, অনেক সম্পদ সাথে দিয়ে।কিন্তু আকবরের ইশারায় আকবরের গুপ্ত চরেরা তাকে খুন করে সম্পদ লুট করে। আকবরের এ কাজটা যে কত বড় অকৃতজ্ঞতা? একবার ভাবুন তো।

বৈরাম খার মৃত্যুর পর আকবর তার হেরেম পত্নী ও উপ-পত্নী দিয়ে ভরানো শুরু করেন। ইতিহাস অনুযায়ী, তার হেরেম ন্যূনতম ৫০০ উপ-পত্নী থাকত।সবচেয়ে বড় কথা আকবর শায়খ আবুল ফজল ও শায়খ ফয়জীর দর্শনে ক্রমে আকৃষ্ট হতে থাকেন। দুই শায়খ বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীতে যত ধর্ম আছে তা সত্য অনুসন্ধানের বিভিন্ন রূপ বৈ কিছুই না। এই পণ্ডিতদের সংস্পর্শে এসে আকবরের ভাবনার জগত তীব্র আন্দোলিত হয়। তিনি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি আবুল ফজল ও ফয়জীর প্রভাবের বলয়ে পড়ে যান।হিন্দু রাজারা আকাতরে আকবর-কে কন্যা দান করত। এসব কন্যারা তার হেরেমের শোভা বর্ধন করত।প্রাপ্তবয়সে এসে রাজপুত রমণী যুধাকে বিয়ে করে যার ষোলকলা পূর্ণ হয়।আকবর মদ্যপানে অত্যধিক আসক্ত ছিলেন। এতে সাম্রাজ্যের একদল আলেম সম্রাটের প্রতি রুষ্ট হোন এবং তাকে ইসলামচ্যুত বলে ফতোয়া দিতে থাকেন।

ইতিহাসের এই কথাগুলো আমাদের সকলেরই জানা আর এর ওপর ভিত্তি করে আকবর কে মুসলমান নামের কুলাঙ্গার হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিছু দিন আগে একটা ডিবেটে আকবর নিয়ে ব্স্তু নিষ্ঠ আলোচনা দেখি। এরপর প্রচলিত গতানুগতিক বইয়ের বাহিরে বেশ কিছু দেশি বিদেশি বইয়ে আকবর নিয়ে কী বলছে তা জানার চেষ্টা করি। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করে আবদুল করিম রচিত ‘ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন’ বইটি, এছাড়া ইতিবৃত্ত থেকে অনেক তথ্য পেয়েছি। এসবের আলোকে আকবর কে একটু ভিন্নভাবে দেখার করার চেষ্টা করব এখন।

আকবরের সময় ভারতীয় সমাজে ধর্মীয় গোঁড়ামি প্রবলভাবে গ্রাস করতে বসেছিল। সমাজে মানুষে মানুষে হানাহানির ধর্মীয় উন্মাদনা সম্রাটকে সবসময় বিচলিত করত। কিভাবে ভারতবর্ষের সব ধর্মের অনুসারীদের অভিন্ন পতাকার ছায়াতলে আনা যায় সে চিন্তায় বিভোর থাকতেন স্বল্পশিক্ষিত অথচ গভীর চিন্তাশক্তির অধিকারী আকবর।

তার পূর্বপুরুষের উদার মনোভাব তার রক্তেও প্রবাহমান ছিল। ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দে আকবর তার সত্যানুসন্ধান দর্শনকে আরো বিকশিত করার মানসে ফতেহপুর সিক্রিতে একটি ইবাদতখানা নির্মাণ করেন এবং সেথায় সব ধর্মের পণ্ডিতদের ধর্ম বিষয়ে বিতর্কের আহ্বান জানিয়ে গমন করতে নির্দেশ দেন। হিন্দু, জৈন, পারসিক, খ্রিষ্টানএবং ইসলাম ধর্মের বড় বড় ধর্মগুরু সেখানে পরস্পর তর্কাতর্কিতে লিপ্ত হোন এবং আকবরের সমন্বিত সারবস্তুর খোঁজে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকেন। সম্রাট পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, তাদের এ বিতর্ক যাতে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ না করে সত্য অনুসন্ধানে আল্লাহর নৈকট্য বা আসল রূপ খুঁজার কাজে ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু ইবাদতখানায় একসময় দেখা যায়, ধর্মগুরুরা প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে পারস্পারিক ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়েন এবং একে অপরের গালমন্দ করা শুরু করেন। অন্যান্য ধর্মের পণ্ডিতেরা মিলিতভাবে তাদের যুক্তি উপস্থাপন করলেও মুসলমান পণ্ডিতেরা তা করতে পারতেন না। এর মূল কারণ শিয়া সুন্নি দ্বন্দ্ব। শিয়ারা সুন্নিদের কে বিপথগামী মনে করত আর সুন্নিরা শিয়াদের মুসলিমই মনে করত না। আকবর প্রায় সময় সকালবেলায় ফতেহপুর সিক্রির রাজপ্রাসাদের সামনে একটি পাথরের উপরে বসে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ দেখে তিনি ব্যথিত হতেন। মুসলমানদের মধ্যে সুন্নী, শিয়া, মাহদভী এবং সূফি মতবাদের বিভেদ দূর করে সকল মতাবলম্বীকে একটি সমঝোতায় আনার চেষ্টা করে।

সম্রাট আকবর একবার মুসলিম আলেমদের একটা প্রশ্ন করে তার যথাযথ উত্তর পাননি। আর এই সুযোগ লুফে নেন অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুরা।হিন্দুদের একটি প্রতিনিধিদল সম্রাটের নিকট এসে তাদের ধর্মমত ব্যাখ্যা করে এবং তাদের দেবতাদের মাহাত্মের কথা আকবরের সম্মুখে উপস্থাপন করে। আকবর তাদের কথা আগ্রহভরে শুনেন এবং তাদের যথেষ্ট সম্মান প্রদান করেন। সম্রাটের এমন ব্যবহারে হিন্দু ধর্মগুরুরা ধরেই নিয়েছিলেন যে, তিনি হয়তো হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে ফেলবেন। আকবর হিন্দুদের ধর্মমত শুনার পাশাপাশি জৈন, পারসিক, খ্রিষ্টান ও শিখ ধর্মগুরুদের কথাও মনোযোগ সহকারে শুনার চেষ্টা করেন।জৈন পণ্ডিত হিরা বিজয় সূরী, বিজয় কোন হুরী প্রমুখ সম্রাটকে জৈন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলেন।

১৫৭৮ খ্রিষ্টাব্দে কয়েকজন জৈন ধর্মগুরু সম্রাটের প্রাসাদে স্থায়ীভাবে অবস্থান নেয়া শুরু করেন। জৈন্য গুরুরাও এক পর্যায়ে বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন যে আকবর হয়তো জৈন ধর্ম গ্রহণ করতে চান কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছেন না। এজন্য জৈন পণ্ডিতগণ সম্রাট বরাবর সরাসরি জৈন ধর্ম গ্রহণের আবেদন তার সামনে পেশ করেন। কিন্তু সম্রাট সে আবেদন বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। বিফল মনোরথে প্রাসাদ ত্যাগ করে জৈন প্রতিনিধি দল। পারসিকরাও আকবরকে তাদের ধর্মে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল। কথিত আছে, এসময় সম্রাট রাজদরবারে সর্বদা আগুন জ্বালিয়ে রাখার নির্দেশ দেন। পারসিক ধর্মগুরু দস্তুর মেহেরজীকে আকবর গুজরাটে দুইশত বিঘা জমিও দান করেছিলেন। খ্রিষ্টান, শিখরাও সম্রাটের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল।

প্রকৃতপক্ষে আকবর কোন ধর্মই শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেননি। তিনি কেবলমাত্র সব ধর্মের ধর্মগুরুদের পর্যাপ্ত সম্মান এবং তাঁদের আলোচনা শুনতেন মাত্র। এতে সম্রাটের উপর পণ্ডিতগণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিশ্বাস করে বসে যে অচিরেই সম্রাট তাঁদের নিজ নিজ ধর্মে ধর্মান্তরিত হবেন। যা ছিল সর্বাংশে ভুল। অবশেষে দ্বিধাগ্রস্ত সম্রাট ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে সকল ধর্মের সারকথার সমন্বয়ে দ্বীন-ই-ইলাহি নামের তথাকথিত ধর্মমতের প্রবর্তন করে তার দোলাচলে থাকা সত্তাকে বন্ধনীতে আবদ্ধ করতে সমর্থ হোন।

দ্বীন-ই-ইলাহির প্রত্যেক সদস্যকে বলা হত সভ্য।সভ্যরা একে অপরের সাথে দেখা করলে জল্ল জলালুল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করতেন। একজন সভ্য মারা যাওয়ার আগেই নিজের জেয়াফতের ব্যবস্থা করতেন। সভ্যের জন্মদিন ঘটা করে পালন করা হত, করা হত ভোজের আয়োজন। সভ্যদের মাংস খাওয়াতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। সম্রাটের প্রতি আনুগত্যের চারটি মানদণ্ড মেনে চলতে হত দ্বীন-ই-ইলাহির সদস্যদের। জান, মাল, সম্মান এবং ধর্ম এ চারটি বিষয়ের উপর নির্ধারণ করা হত সম্রাটের প্রতি ভক্তির মূল্য। যে সভ্য চারটি সম্রাটের তরে সমর্পণ করবে সে প্রথম শ্রেণীর সভ্য, যে তিনটি উৎসর্গ করবে সে দ্বিতীয় শ্রেণীর, যে দুইটি সমর্পণ করবে সে তৃতীয় শ্রেণীর এবং যে একটি উৎসর্গ করে সে চতুর্থ শ্রেণীর সভ্য।দ্বীন-ই-ইলাহি প্রতিষ্ঠার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল মানুষে মানুষে বিবাদ ভুলে গিয়ে একটি সহনশীল ধর্মভিত্তিক উদার সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।

আসলে এটি কোন ধর্ম ছিল না, এটি এক ধরনের মতবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। এই মতবাদের কোন গ্রন্থও ছিল না। সম্রাট এটির প্রচারও করেননি। কাউকে জোর করেও দ্বীন-ই-ইলাহির সদস্য বানান নি। যদি তাই চাইতেন তিনি তবে তার অধীন সকল কর্মকর্তা কর্মচারীদের এ মতের দীক্ষা নিতে প্রলুব্ধ করতেন। কিন্তু আকবর তা করেননি। এজন্য নিদেনপক্ষে আঠারো জন সদস্য শেষ পর্যন্ত জোগাড় করতে সমর্থ হয়েছিলেন সম্রাট, যারা কেবলমাত্র নিজস্ব ইচ্ছায় যোগ দিয়েছিলেন (ইতিবৃত্ত)।

একদল ঐতিহাসিক ভুলভাবে আকবরকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। এদের অন্যতম প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ ও বদায়ূনী। তারা মনে করেন, সম্রাট আকবর শেষ পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন।

রক্ষণশীল মুসলিম ও খ্রিষ্টান লেখকদের প্রভাবে তারা এমনটি বলে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়। বদায়ূনী তার মতের স্বপক্ষে আকবরের তথাকথিত ইসলাম বিরোধী কিছু আইনের উল্লেখ করেছেন। কি ছিল আইনগুলোতে চলুন দেখা যাক: সম্রাটের প্রতি সেজদা দেয়ার রীতি প্রচলিত হয়; দাঁড়ি রাখতে নিরুৎসাহিত করা হয়;গরুর মাংস, পেঁয়াজ, রসুনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়;মসজিদে আযান ও নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করা হয়;মুসলমানদের নামের আগে মোহাম্মদ রাখা বাতিল করা হয়;বার বছর পূর্বের ছেলেদের খতনা বেআইনি ঘোষণা করা হয়; রমজান মাসে রোজা রাখা ও হজ্বযাত্রা রহিত করা হয়;কোরআন, হাদীস শিক্ষা বাতিল করা হয়। এর পরবর্তীতে গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, ইতিহাস পাঠে গুরুত্ব দেয়া হয়;মসজিদকে গুদামে পরিণত করা হয়;ছেলেদের ১৬ বছরের আগে এবং মেয়েদের ১৪ বছরের আগে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। (ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন, আবদুল করিম। পৃষ্ঠা, ২৪৪-২৫১)।

উপরোক্ত আইনগুলো পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় অধিকাংশের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্মের মূলনীতির কোন সম্পর্ক নেই। মসজিদ, আযান, রোজা, হজ্ব নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সম্রাট আকবরের শাসনামলে ভারতীয় মুসলমানদের হজ্বযাত্রার প্রমাণ আছে। সুতরাং হজ্ব পালনে বাধা দেয়ার কথা সত্য নয়। মুসলমান ছেলের আগে মোহাম্মদ নাম রহিত করা, এটিও একটি নির্লজ্জ মিথ্যাচার। খোদ আকবরের নিজের নামেই মোহাম্মদ যুক্ত ছিল এবং তার নাম পরিবর্তন করার কথাও কোথাও শুনা যায়নি। রোজা রাখা ও মসজিদে নামাজ পড়া যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমরা আগেই দেখেছি সম্রাট আকবর ছিলেন এইসব ব্যপারে বেখেয়াল।

তবে তিনি আজমী শরীরের ভক্ত ছিলেন এবং ওখানকার খাদেমদের কথা অনেক গুরুত্ব দিতেন। তিনি মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। তাই তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ ভ্রান্ততারই প্রমাণ দেয়। ধর্ম বিষয়ে স্বাধীন চিন্তাচেতনার উদ্বোধন করে মহান সম্রাট আকবর রক্ষণশীল আলেম উলামাদের বিরাগভাজন হোন। আকবরের শাসনের শুরু থেকেই এসব আলেমগণ তার বিরদ্ধে লেগে ছিল। শেষপর্যন্ত তাকে ইসলামত্যাগীর মিথ্যা তকমা লেপ্টে দিয়ে তারা ক্ষান্ত হয় যা বদায়ূন আর স্মিথের মনোভাবেই প্রতিফলিত হয়।

আকবরের সন্তানরা ইসলামের অনুসারী ছিলেন এবং তারা ইসলামের মধ্যে থেকেই পরবর্তীতে শাসন কার্য পরিচালনা করেছেন। আকবর মৃত্যুর পর তাকে ইসলামী রীতিনীতি অনুযায়ীই দাফন করা হয়। শেষ বিচারের দিন মহান সৃষ্টিকর্তাই তার ব‍্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবেন। আমরা তার ভাল দিকগুলো তুলে সামনে আনি এবং মন্দগুলো বর্জন করি।

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বি.এসসি. (অনার্স), এম.এস. (মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এম. এসসি. (পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

Spread the love

1 thought on “মুগল শাসক আকবর: মুসলিম নামে কুলাঙ্গার না সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাহক?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *