ভালবাসা দিবসের ইতিহাস

মতামত

মো. মোশারফ হোসাইন:

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইন্স ডে। দিনটিকে বিশ্ব ব্যাপী ভালবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এইদিনে প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধ-বান্ধব, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা-সন্তান, ছাত্র-শিক্ষক সহ বিভিন্ন বন্ধনে আবদ্ধ মানুষেরা একে অন্যকে তাদের ভালবাসা জানায়। বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে দিনটিকে খুবই ঘটা করে আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে মর্যাদার সহিত পালন করা হয়।

বাংলাদেশে ভ্যালেন্টাইনস ডে-র প্রথা শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। সাংবাদিক শফিক রেহমান এ দিবসটি প্রথম উদযাপন করেন। লন্ডনে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত থাকার সুবাদে পাশ্চাত্যের প্রথাগুলোর সাথে ছিল তার বেশ ভাল পরিচয়। সেখানে তিনি ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপন দেখেন এবং দেশে ফিরে ১৯৯৩ সালে তিনি এ দিবসটি পালন করেন। লন্ডনে দিবসটি ‘সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’ নামে প্রচলিত থাকলেও আমাদের দেশে আনা হলে ধর্মীয় কারণে ‘সেইন্ট’ বাদ দিয়ে শুধু ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ রাখা হয়।
ভালবাসা দিবস হিসেবে এর প্রচার শুরু হয় যায়যায়দিন পত্রিকার মাধ্যমে। সম্পাদক শফিক রেহমান সেসময় যায়যায়দিন পত্রিকার তেজগাঁয়ের পত্রিকা অফিসের সামনের রাস্তাটির নামকরণ করেন ‘লাভ লেন’ হিসেবে। তখন থেকেই এই দেশে ভালোবাসা দিবসের পথ চলা শুরু।

এবার ভালোবাসা দিবসের Historical Background অর্থাৎ ভালোবাসা দিবস সম্পর্কিত সবগুলো মতামত জানার চেষ্টা করি। প্রাচীন রোমে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল রোমান দেব-দেবীর রানী জুনোর সম্মানে ছুটির দিন। জুনোকে নারী ও প্রেমের দেবী বলে লোকে বিশ্বাস করত। কারো করোমতে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হওয়ার কারণ ছিল এটিই। আবার কেউ বলেন, রোমের সম্রাট ক্লডিয়াস ২০০ খ্রিস্টাব্দে দেশে বিয়ে প্রথা নিষিদ্ধ করেন। তিনি ঘোষণা দেন, আজ থেকে কোনও যুবক বিয়ে করতে পারবে না। যুবকদের জন্য শুধুই যুদ্ধ। তার মতে, যুবকরা যদি বিয়ে করে তবে যুদ্ধ করবে কারা?সম্রাট ক্লডিয়াসের এ অন্যায় ঘোষণার প্রতিবাদ করেন এক যুবক। যার নাম ভ্যালেন্টাইন। অসীম সাহসী এযুবকের প্রতিবাদে খেপে উঠেছিলেন সম্রাট।রাজদ্রোহের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তাকে।১৪ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা মাথা কেটে ফেলা হয় তার।ভালোবাসার জন্য ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগকে স্মরণ করতে তখন থেকেই এ দিনটিকে পালন করা হয় ভ্যালেন্টাইন দিবস হিসেবে।

প্রাচীন রোমে ভ্যালেন্টাইন নামে একজন চিকিৎসক ছিলেন। তিনি রোগীদের প্রতি ছিলেন ভীষণ সদয়। অসুস্থ মানুষের ওষুধ খেতে কষ্ট হয় বলে তিনি তেঁতো ওষুধ ওয়াইন, দুধ বা মধুতে মিশিয়ে খেতে দিতেন। সেই ডাক্তার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। প্রাচীন রোমে খ্রিস্টধর্ম তখন মোটেও জনপ্রিয় ছিল না। এই ধর্মে বিশ্বাসীদের শাস্তি দেওয়া হতো।একদিন রোমের এক কারা প্রধান তার অন্ধ মেয়েকে ভ্যালেন্টাইনের কাছে নিয়ে এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। ভ্যালেন্টাইন কথা দিয়েছিলেন তিনি তার সাধ্যমতো চিকিৎসা করবেন। মেয়েটির চিকিৎসা চলছিল এমন সময় হঠাৎ একদিন রোমান সৈন্যরা এসে ভ্যালেন্টাইনকে বেঁধে নিয়ে যায়। ভ্যালেন্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন, খ্রিস্টান হওয়ার অপরাধে তাকে মেরে ফেলা হবে। ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দে বা কারও মতে ২৭০খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি রোম সম্রাট ক্লডিয়াসের আদেশে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।তার আগে ভ্যালেন্টাইন অন্ধ মেয়েটিকে বিদায় জানিয়ে একটি চিরকুট লিখে রেখে গিয়েছিলেন। তাকে হত্যার পর কারা প্রধান চিরকুটটি দিয়েছিলেন মেয়েটিকে। তাতে লেখা ছিল, ‘ইতি তোমার ভ্যালেন্টাইন’ (‘From your Valentine’)। মেয়েটি চিরকুটের ভেতরে বসন্তের হলুদ ত্রৌকস ফুলের আশ্চর্য সুন্দর রং দেখতে পেয়েছিল কারণ, ইতোমধ্যে ভ্যালেন্টাইনের চিকিৎসায় মেয়েটির অন্ধ দু’চোখে দৃষ্টি ফিরে এসেছিল। ভালবাসার এসব কীর্তির জন্য ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে পোপ জেলাসিয়ুস ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখকে ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই থেকে এই দিনটিকে মানুষেরা ভ্যালেন্টাইন্স ডে হিসেবে পালন করে আসছে।

ভালোবাসা দিবস একটি বিদেশি প্রথা ও পালনে ধর্মীয় কিছু বিধিনিষেধ থাকার কারণে একটা বড় অংশ এই প্রথাকে বর্জন করে এবং এর ক্রুটি গুলো সবার সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। তাদের কাছে ভিনদেশি এ প্রথার অনুপ্রবেশ দেশি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি। তবে তরণ-তরুণীদের মাঝে এটি যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং এখন এটি আমাদের দেশে বৃহৎ পরিসরে উদযাপন করা হয় নানা ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে। সিদ্ধান্ত আপনার?

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বি.এসসি. (অনার্স), এম.এস. (মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এম. এসসি. (পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

Spread the love

1 thought on “ভালবাসা দিবসের ইতিহাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *