ভারত-পাকিস্তানের মাধ্যমেই কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ?

মতামত

শামসুল হক:

ভারত-পাকিস্তান চীর শত্রু রাষ্ট্র একে অপরের কাছে বলেই মনে করেন উভয় রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ থেকে কর্তা ব্যক্তিরা। দেশ দুটির মধ্যে রয়েছে চরম প্রতিযোগিতা কে কাকে ঘায়েল করতে পারবে। যাকে শুদ্ধভাবে বলা যায়, একে অপরকে আক্রমন করার চেষ্টায় থাকেন সব সময়। ব্রিটিশদের কাছে থেকে স্বাধীনতার আগে থেকে দুই দেশের ভূখণ্ডের নেতাদের মধ্যে ছিল বৈরিভাব। দেশ দুটির মধ্যে ইতোমধ্যে সম্মুখ যুদ্ধও হয়েছে কয়েকবার বলা যায়। আবার নতুন করে যুদ্ধ লাগতে পারেই বলে অনেকেই এই মহূর্তে আবাশ পাচ্ছেন। নতুন করে যুদ্ধ লাগলে কি হতে পারে এটা নিয়ে অনেকেই দুঃচিন্তায় রয়েছেন বলেই প্রতীয়মান। অনেক্ই অনুমান করছেন, ভারত-পাকিস্তানের মাধ্যমেই কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে? এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অনেকর মনেই। কি হয় সেটাই দেখার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে এখন।

বৃটিশদের কাছ থেকে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন থেকেই দেশ দুটির মধ্যে বিরোধ বিরাজ করে আসছে। তার ফল ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ যদিও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কিন্তু এর রেশ মনে হয় এখনও শেষ হয়নি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের পক্ষে নিয়ে কাজ করে ভারত। ভারতের সহযোগিতা ছাড়া বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আশা করাই উচিৎ হবে না। সেই থেকে ভারত বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোরও পরিকল্পনা করেছিল। সেই যাত্রায় বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষ নেয় রাশিয়ার মতো শক্তিধর দেশ। আর পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল আমেরিকার মতো শক্তিধর দেশ। এতে অনেকই মনে করেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। সেটা সম্ভাবনাও ছিল।

এখন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লাগতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে কি না এটা নিয়ে সারা বিশ্বে ভেবে দেখতে পারে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতে জম্মু-কাস্মিরে আত্মঘাতি বোমা হামলা করা হয়েছে। এই হামলায় ভারতের আধা সামরিক বাহিনীর ৪৪ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছিলেন আরও বেশ কয়েকজন। সেই হামলার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ি করে আসছে।
আবার এর মধ্যে আজ সোমবার পুলওয়ামাতে আবারও জঙ্গি হামলা করা হয়েছে। এতে একজন মেজরসহ পাঁচজন সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কাঁটা ঘায়ের দাগ শুকাতে না শুকাতেই আবার যেন লবণের ছিটা। তাই এই ঘটনা নিয়ে পাল্টা আবার আক্রমণ হতে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) পুলওয়ামাতে আরডিএক্স বিস্ফোরক ভর্তি গাড়ি নিয়ে ‘সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স’র গাড়ি বহরে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এতে বহরের ৭০টি গাড়ির মধ্যে একটি বাস সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়ে যায়। প্রাণ হারায় বাহিনীর অন্তত ৪৪ সদস্য। হামলার পর জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদ ঘটনার দায় স্বীকার করে দেওয়া বিবৃতিতে জানায়,তাদের হয়ে পুলওয়ামারই বাসিন্দা আদিল আহমেদ দার ওই হামলা চালিয়েছে।

এর হামলার কথা বলেতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আমার হৃদয়েও আগুন জ্বলছে। সেই আগুন নিভাতে কি পাকিস্তানের ওপর হামলা করতে পারে? এরকম কিছু যদি ঘটে তাহলে কি হতে পারে। আবার ভারতের কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ও বিজিপির প্রভাবশালী নেতা অরুণ জেটলি ১৪ ফেব্রুয়ারির হামলার পর বলেছিলেন, প্রতিশোধ নেওয়ার কথা। তিনি বলেছিলেন, হামলাকারীদের ওপর পাল্টা হামলা করা হবে। তবে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ভারত-পাকিস্তানের এই যুদ্ধ লাগলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেকোনো সময় লাগতে পারে। কারণ ১৪ ফেব্রুয়ারির হামলার পর ভারত সীমান্তে যুদ্ধের প্রস্তুতিমুলক যুদ্ধ বিমানসহ বিভিন্ন যুদ্ধের অস্ত্রের প্রস্তুতি দেখিয়েছে।

আর ভারত-পাকিস্তানকে হামলা করলে সেক্ষেত্রে চীন পাকিস্তানকে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসতে পারে। এশিয়া মহাদেশে ভারত ও চীন ক্ষমতাধর দেশ। একে অপরের মধ্যে ঠাণ্ডা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে চীন চাইবে পাকিস্তানকে উসকে দিতে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে। আবার আমেরিকা মনে করছে চীন এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করেছ তাই ভারতেকে কাছে পেতে চাইবে। এ জন্য চীনকে এক হাতে নেওয়ার জন্য ভারতেই পারবে সেটা। সে জন্য ভারকে উসকে দিতে পারে আমেরিকা। এদিকে, পাকিস্তান মুসলিম দেশগুেলোর সমর্থন পাবে আশা করছে। ফলে মুসলিম দেশগুলোর সমর্থন পেলে নিজেকে আরও শক্তিশালী ভাবতে পারে পাকিস্তান। সেই অহংকারবোধ থেকে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে।

সবেচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। ভারত-পাকিস্তান দুটো দেশেরই পারমানিক শক্তিধর দেশ। ভারত-পাকিস্তারের পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে। এখন যদি যুদ্ধ হয় তাহলে সারা বিশ্বের কি হবে। যুদ্ধ কখনও শান্তি বয়ে আনে না। যুদ্ধের ভয়াবহ তা ভুলে গেছে সারাবিশ্ব। ফলে দুটো দেশকে থামানোর মতো কোনো চেষ্টা করছে না।

শহরে আগুন লাগলে যেমন সব কিছু পুড়ে যায়। কোনো কিছুই রক্ষা পায় না তেমনি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লাগলে সারাবিশ্বের অনেক দেশকে এর মাশুল গুনকে হবে। যারা নিজেকে নিরাপদ মনে করছে তারাও নিরাপদ হতে পারবে না বলেই মনে হয়। কারণ আগুন বেচে বেচে লাগবে না সারাবিশ্ব সেই আগুনে পুড়ে যেতে পারে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না এজন্য যে, ভারতের সব চাইতে জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ও নেতা নরেন্দ্র মোদি। আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সাবেক ক্রিকেটার ইমরান সেনাসমর্থিত তাই দুটো দেশের প্রধানমন্ত্রীই নিজেকে ক্ষমতাধর ও শক্তিশালী দাবি করতেই পারেন। আর তারা যদি কোনো উগ্র চিন্তা থেকেই যুদ্ধের মতো খেলায় জড়িয়ে পড়ে এর ফল শুভ হবে না বলেই মনে হয়। আর এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা সাধারণ মানুষ আশা করে না। সাধারণ মানুষ শান্তি চায়। যুদ্ধ নয়। শান্তি চাই। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চাই না। সারা বিশ্বের শান্তি চাই। আলোচনার মধ্যে শান্তি আসুক। বিশ্বনেতারা দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন এ ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

ভারত-পাকিস্তানের মাধ্যমেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগুক এটা আশা করি না। বিশ্ব মোড়লরা ভারত-পাকিস্তানের এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এমনটা প্রত্যাশা থাকলো। সেই সঙ্গে আরও প্রত্যাশা ভারত-পাকিস্তানের মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নয়, সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ুক সারাাবেশ্বে।
লেখক: সাংবাদিক।

Spread the love

2 thoughts on “ভারত-পাকিস্তানের মাধ্যমেই কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *