বাংলাদেশের বাহিরে বাংলা ভাষা আন্দোলন নিয়ে কতটুকু জানেন?

মতামত

মো. মোশারফ হোসাইন:

বাংলা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। বাংলা বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা ও একমাত্র রাষ্ট্রভাষা; এছাড়া বাংলা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রধান কথ্য ভাষা বাংলা। এসব বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলের বাইরেও ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, মেঘালয়, মিজোরাম, উড়িষ্যা রাজ্যগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলাভাষী জনগণ রয়েছে। সারা বিশ্বে সব মিলিয়ে ২৬ কোটির অধিক লোক দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ব্যবহার করে। কিন্তু বাংলা কে রক্ষা করতে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বর্তমান বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা নিজেদের বুকের তাজা রক্তের মাধ্যমে মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানী শাসক আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা করে। এই আন্দোলনের ফলে বাংলা পায় তখনকার অ-খন্ড পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। বাংলাদেশের বাঙালির অহংকার অমর একুশে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সকল মাতৃভাষা প্রেমী মানুষ আজ এ দিবসটি নিয়ে অহংকার এবং গর্ব করে। এই আন্দোলনের বাহিরে আরেকটি আন্দোলন হয়েছিল বাংলা ভাষাকে নিয়ে, আজ আমারা জানার চেষ্টা করব ঐ আন্দোলন নিয়ে।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাহিরে আসামের শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে গড়ে ওঠতে থাকে সমৃদ্ধ বাঙালি জনপদ। তাদের মুখের ভাষা এবং সাহিত্য, সংস্কৃতির বাহন হিসেবে বাংলা ভাষা আসামের সমাজ ও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এমতাবস্থায় ১৯৫০ সালে আসামে এক সময় গড়ে ওঠে ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন। এর নেতৃত্ব প্রদান করেন উগ্রবাদী অসমিয়া সম্প্রদায়। অসমিয়া জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি এবং অসমিয়া ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম ও সরকারি ভাষারূপে প্রতিষ্ঠা করার ইন্ধন যোগাতে ব্রিটিশ ও আমেরিকানদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। ১৯৪৮ সালের মে মাসে গোহাটি শহরে তারা বাঙ্গালিদের উপর আগ্রাসন চালায়। ১৯৬০ সালের ৩ মার্চ আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা বিধান সভায় অসমিয়াকে আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা ঘোষণা করা হবে বলে জানান। উক্ত ঘোষণার প্রতিবাদে ১৯৬০ সালের ১৬ এপ্রিল শিলচরে বাংলাভাষা-ভাষী বাঙালিরা এক নাগরিক সভা আহ্বান করেন। উক্ত সভা শেষে সরকারি ভাষা-প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন অধ্যাপক শরৎচন্দ্র নাথ।

একই বছরে অর্থাৎ ১৯৬০ সালের ২ ও ৩ জুলাই শিলচরে চপলাকান্তের সভাপতিত্বে ‘নিখিল আসাম বাঙ্গালা ভাষা সম্মেলন’ নামে ভাষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবি জানানো হয় এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাপার’ গান গেয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। এভাবেই বাংলা ভাষার স্বপক্ষে আসামে চলতে থাকে নানা কর্মসূচি। এরপর ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর আসাম রাজ্যের সবর্ত্র অসমিয়া ভাষা প্রয়োগের জন্য বিধান সভায় ভাষা বিল উত্থাপন ও পাস হয়। এভাবে আসামের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ লক্ষ লক্ষ বাঙালি এবং সেই সঙ্গে অনসমিয়া গোষ্ঠীর বাংলাকে সরকারি ভাষা করার মৌলিক অধিকারের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়। এই আইনের প্রতিবাদে বাংলা ভাষার স্বপক্ষ শক্তি আরো ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। বাংলা ভাষার দাবিতে গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। এই আইনের প্রতিবাদে পণ্ডিত রাজমোহন নাথের সভাপতিত্বে ১৮, ১৯ ও ২০ নভেম্বর শিলচরে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল সম্মেলন।

সম্মেলনে গৃহীত এক সিদ্ধান্তে বলা হয়, “যদি এই আইন করে বাংলা ভাষাকে অসমিয়া ভাষার সমমর্যাদা দেয়া না হয় তবে বাঙালি সমাজের মৌলিক অধিকার ও মাতৃভাষা রক্ষার্থে আসামের বাংলা ভাষা অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো বৃহত্তর আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অপরিহার্য হয়ে পড়বে।” পরে শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে ‘কাছাড় সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে সরকারকে চরমপত্র দেয়া হয় এই ভাষায় : ১৩৬৭ বঙ্গাব্দের ৩০ চৈত্রের মধ্যে ভাষা আইন যথাযথ সংশোধন করে বাংলাকে পূর্ণ মর্যাদা যদি না দেয়া হয় তবে কাছাড়ের জনসাধারণ ১৩৬৮ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখ থেকে অহিংস গণ-আন্দোলনের সূচনা ঘটাবে। উল্লেখ্য, এই চরমপত্র প্রদানকারীরা তারিখ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় খ্রিস্টাব্দের পরিবর্তে বঙ্গাব্দ ব্যবহার করেন। সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৬১ সালের ১৯ মে থেকে সমগ্র কাছাড়ে বাংলাকে সরকারি ভাষা করার দাবিতে অহিংস অসহযোগ গণ-আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো ১৯৬১ সালের ১৮ মে রাত ১২ টার পর থেকে প্রায় ১০ হাজার তরুণ-তরুণী বিভিন্ন বয়সের মানুষ শিলচর রেলস্টেশনে অহিংস অবস্থান ধর্মঘট করার জন্য সমবেত হতে থাকে।

অবশেষে আসে ১৯ মে ১৯৬১; শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। উত্তেজিত জনতার প্রতিরোধে সরকারের বাহিনী ট্রেন চালাতে ব্যর্থ হন। ১৯ মে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। পুলিশ এদের অনেককেই গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। বিভিন্ন দফায় লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাসের সঙ্গে যোগ দেয় এবং তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে অনেক রেলকর্মচারীও। বেলা আড়াইটার দিকে রেলস্টেশনে কর্তব্যরত বিএসএফ-এর সদস্যরা হঠাৎ গেরিলার ভঙ্গিতে গুলিবর্ষণ আরম্ভ করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ শহীদ হন ৯ জন। তারা হলেন- সুনীল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্থ, কুমুদ দাস, চন্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, হীতেশ বিশ্বাস, শচীন্দ্র পাল, কমলা ভট্টাচার্য, কানাই নিয়োগী। পরদিন স্টেশনের পুকুর থেকে সত্যেন্দ্রকুমার দেবের বুলেটবিক্ষত দেহ উদ্ধার করা হয়। রাতে হাসপাতালে মারা যান বীরেন্দ্র সূত্রধর। মোট ভাষাশহীদদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ জন।

১৯ মে পুরো দিনটি ছিল উত্তাল ও ঘটনাবহুল। প্রশাসন এর কার্ফ্যু জারি করে, গ্রেফতার করা হয় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষকে। কিন্তু এতেও ক্ষান্ত হননি আন্দোলনকারীরা। তাদের রক্ত আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অবশেষে ওই অঞ্চলের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রশাসনিক স্বীকৃতি দিতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। ১১ জন ভাষাশহীদের রক্তের বিনিময়ে অবশেষে তখনকার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী প্রদত্ত সূত্রের উপর ভিত্তি করে গৃহীত সংশোধনী আইনে কাছাড় জেলায় বাংলাভাষা ব্যবহারের অধিকার স্বীকার করে নেন। এভাবেই আসাম রাজ্যে ভাষা-আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে এবং বাংলা ভাষা বিধান সভায় স্বীকৃতি পায়।

বাংলা ভাষার ইতিহাসে ১৯ মের ঘটনা একটি স্মরণীয় অধ্যায় হওয়া সত্ত্বেও আমরা অনেকেই এ ব্যাপারে জানি না। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় শুধু বাংলাদেশের বাঙালিরা নয়, আসামের বাংলাভাষী বাঙালিরাও জীবনদান করেছে। বাংলা ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসে এ এক অমর ইতিহাস। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ১৯ মে বাংলা ভাষার জন্য রক্তদানের ঘটনাটি বাঙালির ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উপেক্ষিত এবং বিস্মৃত অধ্যায়। এখনো আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ এই ব্যাপারে কিছুই জানে না। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশে যেমন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিক, অহিউল্লাহসহ আরো অনেকে জীবনদান করেছেন ঠিক তেমনি আসামের শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন ১১ জন ভাষাবীর।

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সকল ভাষা শহীদদের।

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বি.এসসি. (অনার্স), এম.এস. (মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এম. এসসি. (পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *