পৃথিবীর ভূ-চুম্বকক্ষেত্র ও চুম্বক সব সময় উত্তর দক্ষিণ হয়ে থাকে কেন?

মতামত

মো. মোশারফ হোসাইন:

পৃথিবীর দুই প্রান্তে চৌম্বকীয় মেরু কিভাবে সৃষ্টি হল তা নিয়ে রয়েছে নানা মতবাদ। তবে সকল স্তরের গবেষকরা অবশ্য এই নিয়ে একটা জায়গায় একমত অর্থাৎ কিভাবে এর সৃষ্টি এবং কেন সব সময় উত্তর দক্ষিণে ঝুঁলে থাকে। এসব জানার আমাদের কে আগে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠনটা একটু জানতে হবে। এর আগে চুম্বকের ইতিহাসটা একটু দেখে নেই। তারপর পৃথিবীর গঠন নিয়ে বলার চেষ্টা করি।

এশিয়া মহাদেশের ম্যাগনেশিয়া নামের একটি জায়গায় মানুষ এক অদ্ভুত পাথরের সন্ধান পেল। আশ্চর্য তার গুণ। দেখা গেল, ওই পাথরের রয়েছে লোহার টুকরাকে টেনে ধরার চমত্কার ক্ষমতা। কৌতূহলী মানুষ লোহার টুকরা সেই পাথরের কাছে নিয়ে বারবার পরখ করে দেখল। প্রতিবারই দেখা গেল অদৃশ্য কোনো এক শক্তিতে এই পাথর লোহাকে কাছে টানছে। আর লোহা পাথরের গায়ের সঙ্গে এসে লেপ্টে বসছে। এটিকে ঝুলিয়ে দিলে তা সবসময় উত্তর-দক্ষিণমুখী হয়ে থাকে।
পাথরের এই অদৃশ্য আকর্ষণশক্তি দেখে মানুষ বিস্মিত হলো। এভাবেই আবিষ্কৃত হলো চুম্বক পাথর। ম্যাগনেশিয়াতে এই পাথর পাওয়া গেল বলে সেই জায়গার নাম অনুসারে এই আশ্চর্য পাথরের নাম রাখা হলো ম্যাগনেটাইট।

পৃথিবীর আকৃতি কমলা লেবুর মতো হলেও এর অভ্যন্তরীন গঠন অনেকটা পেয়াজের মতো বিভিন্ন খোলসাকৃতির স্তরে বিন্যস্ত। এই স্তরগুলোকে তাদের বস্তুধর্ম এবং রাসায়নিক ধর্ম দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোর বাহিরের দিকে রয়েছে সিলিকেট দিয়ে তৈরি কঠিন ভূত্বক বা ক্রাস্ট (Crust), তারপর অত্যন্ত আঠালো একটি ভূ-আচ্ছাদন বা ম্যান্টল (Mantle)। পৃথিবীর একদম ভেতরে থাকে কোর (Core)। এই কোরের আবার দুইটা অংশ।একটাকে বলা হয় ইনার কোর (Inner core) আরেকটা আউটার কোর (Outer core)। যত ভেতরে যাওয়া যায় ভূপৃষ্ঠ থেকে তাপমাত্রাও ততই বাড়তে থাকে। সে হিসেবে ইনার কোরটা তরল হবার কথা।কিন্তু এটা কঠিন অবস্থায় থাকে। একদম কেন্দ্রে বিদ্যমান প্রচন্ড চাপ ইনার কোরকে বিপুল তাপমাত্রায়ও তরল হতে দেয়না। সে তুলনায় আউটার কোর এ চাপ কিছুটা কম। তাই উচ্চ তাপমাত্রায় এটা তরল অবস্থায় থাকে। ইনার কোরে মূলত আয়রন (Fe) ও নিকেল (Ni) থাকে।

একসময় ভাবা হত পৃথিবীর মধ্যে একটা বিশাল দন্ড চুম্বক আছে।এই চুম্বকের কারণেই ভূচুম্বকত্বের সৃষ্টি।কিন্তু যে কোন পদার্থের জন্যই কুরি তাপমাত্রা বলে একটা তাপমাত্রা আছে যার উপরে কোন তাপমাত্রায় ঐ পদার্থের চৌম্বকত্ব লোপ পায়।লোহার জন্য এর মান 1043 কেলভিন। এখন কেন্দ্রে যদি একটা চুম্বক আসলেই থাকত তাহলে ঐ তাপমাত্রায় কিন্তু তার চুম্বক ধর্ম লোপ পেয়ে যেত। তাই এই যুক্তিটা ঠিক না।

1939 সালে জার্মানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান বিজ্ঞানী Walter Elsasser প্রস্তাবনা রাখেন ভূ-চুম্বকক্ষেত্রের সৃষ্টির পেছনে ডায়নামো মেকানিজম বলে একটা মেকানিজম কাজ করে। তার এই মতবাদটাই এখন পর্যন্ত বহুল প্রচলিত। এই মতবাদ অনুযায়ী, পৃথিবীর ইনার কোরটা খুব উত্তপ্ত।এর বাইরের আউটার কোর তরল ও তাপমাত্রা ইনার কোর অপেক্ষা কম।প্রকৃতপক্ষে ইনার কোর থেকে যত উপরে যাওয়া যায় তাপমাত্রাও ততই কমতে থাকে। যেহেতু আউটার কোর তরল এবং এর উপরে ও নিচে তাপমাত্রার পার্থক্য বিদ্যমান তাই পরিচলন প্রক্রিয়ায় তাপ সঞ্চালন শুরু হয় অর্থাৎ ইনার কোর এর কাছে অবস্থিত আউটার কোর এর তরল বেশি উত্তপ্ত হয়ে যায়। এতে তার আয়তন যায় বেড়ে এবং ঘনত্ব যায় কমে। কিন্তু আউটার কোর এর উপরের দিকের যে তরল আছে তা সে তুলনায় কম উত্তপ্ত বা বেশি ঘন থাকে। তাই নিচের কম ঘন তরল উপরে যেতে থাকে এবং উপরের বেশি ঘন তরল নিচে আসতে থাকে, শুরু হয় পরিচলন স্রোত। শুধু তাই না,পৃথিবীর নিজেরও একটা আবর্তন বেগ আছে। এই বেগ ও পরিচলন স্রোতের কারণে আউটার কোর এর তরল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে থাকে। আউটার কোরে যে পদার্থ থাকে তা অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় আয়নিত অবস্থায় থাকে।তাই যখন এই চার্জিত কণা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যায় বা তড়িতশক্তির সৃষ্টি হয়, তখন একটা চৌম্বকক্ষেত্রেরও সৃষ্টি হয়। আমরা সকলেই জানি যে, গতিশীল চার্জ চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করতে পারে এখানে ও তাই হয়। অর্থাৎ এই পরিচলন স্রোতের কারণে (যার যান্ত্রিক শক্তি থাকে) তড়িৎ শক্তি সৃষ্টি হয়। ঠিক ডায়নামো বা জেনারেটর যা করে তাই এখানে সৃষ্টি হলো অর্থাৎ যান্ত্রিক শক্তি তড়িৎ শক্তিতে পরিণত হলো। এজন্য একে ডায়নামো মেকানিজম বলা হয়। এই তড়িতশক্তিই পরবর্তীতে চুম্বকক্ষেত্রের সৃষ্টি করে যাকে ভূ-চুম্বকক্ষেত্র বলা হয়ে থাকে।

এতক্ষণ অনেক জটিল ও প‍্যাচানো কথা বলা হয়েছে, অনেকেরই মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে পারে। মোটাদাগে পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে, এতে তড়িৎ উৎপন্ন হয় এবং সাথে সাথে এই তড়িৎ থেকে ভূ-চুম্বকক্ষেত্রর উদ্ভব হয়। এখন কথা হল চুম্বক দণ্ড সবসময় উত্তর দক্ষিণে ঝুলে থাকে কেন? এতক্ষণ আমারা জানলাম পৃথিবী নিজেই একটা একটা বিশাল চুম্বক। সুতরাং ঘূর্ণনের কারণে এর উত্তর দক্ষিণ ভৌগোলিক মধ্যতল বরাবর চুম্বক মধ‍্যতল সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর উত্তর মেরু বরাবর এর দক্ষিণ চুম্বক মধ্যতল এবং দক্ষিণ মেরু বরাবর এর উত্তর চুম্বক মধ্যতল সৃষ্টি হয়। সহজভাবে বললে উত্তর মেরু বরাবর পৃথিবী নামক চুম্বকের দক্ষিণ মেরু, দক্ষিণ মেরু বরাবর পৃথিবী নামক চুম্বকের উত্তর মেরু। আমরা জানি, চুম্বক তার বিপরীত মেরুকে আকর্ষণ করে আর এ জন্যই দণ্ড চুম্বক উত্তর দক্ষিণ বরাবর অবস্থান করে। অর্থাৎ পৃথিবী নামক চুম্বকের দক্ষিণ মেরু বরাবর দণ্ড চুম্বকের উত্তর মেরু আকর্ষিত হয় এবং উত্তর মেরু বরাবর দণ্ড চুম্বকের দক্ষিণ মেরু আকর্ষিত হয়।

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বি.এসসি. (অনার্স), এম.এস. (মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এম. এসসি. (পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *