পুরান ঢাকার ঐতিয্য রক্ষাতে প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা সংস্কার

Breaking News: প্রধান সংবাদ বাংলাদেশ রাজধানী

রাজধানীর ইতিহাস ও ঐতিয্য বহন করছে পুরান ঢাকার কিছু স্থাপনা। যেগুলো হেরিটেজের অন্তর্ভূক্ত। সম্প্রতি এমনি একটি ভবন ধসে নিহত হয়েছেন বাবা-ছেলে। ফলে নতুন করে এই হেরিটেজ স্থাপনাগুলো ভাঙ্গার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, এই ভবনগুলো না ভেঙ্গে সংস্কার করলে মৃত্যুঝুঁকি যেমন কমে যাবে তেমনি রক্ষা পাবে পুরান ঢাকার ঐতিয্য।

ঢাকাকে উত্তর কলকাতা, দিল্লী, আহমেদাবাদ কিংবা লন্ডনের মতো করে পুরাকীর্তির ঐতিহ্য বহাল রেখে সাজিয়ে তোলা যেতে পারে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা আরও দাবি করেন, এ ধরণের পদক্ষেপ নিতে পারলে ঢাকাকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের নতুন ক্ষেত্রও উন্মোচিত হতে পারে।
পুরানা ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো সংস্কার না করে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও রাজউক বলে অভিযোগ করেছন তারা।

২০০৯ সালে রাজউকের পক্ষ থেকে পরিচালিত জরিপে ৯৩টি ভবন এবং ফরাশগঞ্জ, সূত্রাপুর, শাখারিবাজার, রমনা অঞ্চলকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ওই জরিপে আরও দেখা যায়, ওই সব অঞ্চলগুলোর মোট ১৩টি স্ট্রিটের অন্তর্ভূক্ত স্থাপনাগুলো হেরিটেজে অন্তর্ভূক্ত ছিল। ঢাকার পাতলা খান লেন, হেমেন্দ্র দাস লেন, প্যারিদাস রোড, ফরাশগঞ্জ রোড, বি কে দাস রোড, কে বি রোড, আজিমপুর, হাজারিবাগ, ওয়ারীসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকার পুরনো স্থাপনাগুলোর কোনরূপ ক্ষতিসাধন, অনুমতি ব্যাতিরেকে সংস্কার, ভেঙ্গে ফেলাতে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয়ে আছে।

সেসব স্থাপনার দেখভাল করার দায়িত্ব ন্যাস্ত আছে ঢাকা জেলা প্রশাসনের হাতে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হাতে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে হেরিটেজ অঞ্চল এবং সেখানকার স্থাপনাগুলো সরকারিভাবেই ভাঙ্গার তালিকায় পড়ে আছে। কোন কোন ক্ষেত্রে অযত্ন অবহেলা বা দেখভালের অভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে।
এসব স্থাপনাগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করার কথা। কিন্তু তা না করে উলটো দুর্ঘটনা ঘটলেই ভবনগুলোকে ভেঙ্গে ফেলার কথা বলা হয়। এমন দাবি করছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায় যে, অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) জিওডেসেক কনসালট্যান্টস অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তালিকা করে পুরান ঢাকার ৫৭৩টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ১৪৫টিকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়। এসব ঝুকিপূর্ণ ভবনের অনেকগুলোই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের স্থাপনা বা সংরক্ষিত ঐতিহ্যের তালিকায় পড়ে। যেমন- হেরিটেজ হিসেবে ঘোষিত ফরাশগঞ্জের ‘বড়বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত ভবনটি সিটি কর্পোরেশন ও রাজউক বিপজ্জনক হিসেবে দেখিয়ে ভেঙ্গে ফেলার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু চারদিক থেকে আপত্তি উঠলে তা থেকে সরে আসে সিটি কর্পোরেশনের নগর পরিকল্পনা শাখা। এরকম জটিলতার মধ্যে রয়েছে আরো অনেকগুলো স্থাপনা। যেমন লক্ষী নারায়ন জিউ মন্দির, বনগ্রাম রোডের ব্রিটিশ কালেক্টরেট ভবন, সূত্রাপুরের ফায়ার সার্ভিস ভবন, পাটুয়াটুলি রোডের ২৭ নাম্বার হোল্ডিং(জেলা প্রশাসনের ৮ নম্বর হেরিটেজ)।

ঢাকার নগর সংস্কৃতির ঐতিহ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে আসছে নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন ‘আরবান স্টাডি গ্রুপ’। ২০১২ সালের সংগঠনটির করা একটি রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ২০১৬ সালে এসে ১৬০০ স্থাপনার তালিকা করে। কিন্তু আদালতকে তোয়াক্কা না করে রাজউক শুধু ৭৫টি গুরুত্বপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ করলে আবারো রিট করা হলে সর্বশেষ পুনরায় তালিকার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। এখন পর্যন্ত সেটিই চূড়ান্ত বলে দাবি করছে আরবান স্টাডি গ্রুপ।

নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষ্যমতে, পুরনো ঢাকাকে নতুন ঢাকার মতো করে ধরে নিয়ে পরিকল্পনা করায় আপত্তি করছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এরকম করলে আবাসনের চাহিদা মেটানো যাবে কিন্তু এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বা প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যকে ধ্বংস করা হবে। পুরনো ঢাকাকে ঘিরে এমন পরিকল্পনাই নেয়া উচিত যাতে করে পুরনো ঢাকার স্থাপনার ঐতিহ্য অটুট থাকে।

হেরিটেজ স্থাপনা কিভাবে ভাঙ্গার তালিকায় আসে এমন প্রশ্ন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ঢাকা রিজিওনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাখি রায়কে করা হয়। এ ব্যাপারে তিনি উলটো জিজ্ঞেস করেন এরকম হেরিটেজ কি আছে ভাঙ্গার তালিকায়। ফরাশগঞ্জের বড়বাড়ি এবং অন্যান্য স্থাপনার কথা জানানো হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

স্থাপনা সংরক্ষণে তাদের ভূমিকা জানতে চাইলে তিনি জানান, তারা পর্যায়ক্রমে কাজ করছেন তালিকা ধরে ধরে। এসব এলাকা হেরিটেজ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে বলা হলেও তিনি বলেন, পুরনো হলেই কোন স্থাপনা সংরক্ষিত হতে পারে না। সংরক্ষণ করতে হলে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকতে হবে।

ঢাকার স্থাপনাগুলোর ঝুঁকি নিয়ে আরবান স্টাডি গ্রুপের সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ তাইমুর রহমান বলেন, প্রকৃতপক্ষে দেখা গেছে যেসব ভবন ধসে পড়েছে সেসব ভবনের পাশের নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্ট নির্মাণ করতে গিয়ে পুরনো ভবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিলো, সময়মতো সংস্কার করা হয়নি। কর্তৃপক্ষ যদি ভবনগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করে সময় মতো সংস্কার করতো তাহলে এসব দুর্ঘটনা ঘটতোই না।

তিনি ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেন। তিনি বলেন, একটি ভবনের ‘সয়েল টেস্ট’ করতেই বেশ কিছুদিন লেগে যাবার কথা। সুতরাং এক মাসের মধ্যে ৭০০-৮০০ ভবনের তালিকার যথার্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

পুরান ঢাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সুকলাল দাস লেন, প্যারিদাস রোড, রূপচান লেনের কয়েকটি বাড়ি ভাঙ্গার কাজ চলছে। এছাড়াও সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, আজিমপুর, চকবাজারে পুরানা ভবনের আধিক্য কমে আসছে।
যেসব পুরানা ভবন ব্যক্তিগত দখলে আছে সেসবের নকশা নষ্ট হচ্ছে। সেগুলো সংস্কার করা হচ্ছে না। কিন্তু মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন অনেকেই।

সিটি কর্পোরেশন যদি সংস্কার করে ভবনের নকশাকে অক্ষুণ্ণ রেখে তাদের বসবাসের নিশ্চয়তা দিতে পারতো তাহলে ঝুঁকি কমে যেতো বলে মনে করেন বাসিন্দারা। তবে নগরবিদরা বলছেন, এসব করার জন্য সদিচ্ছা বা পরিকল্পনা দরকার।
ভবনগুলো কীভাবে সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় তার খুব সহজ কতগুলো পথও তারা দেখিয়েছেন। যেসব ভবনের ছাঁদ ঝুঁকিতে আছে সেখানে ভবনের বাহ্যিক কাঠামো ঠিক রেখে ছাদ মেরামত করলেই ঝুকিমুক্ত হয়ে যায়। কারণ এসব ভবনের দেয়াল খুব পুরু থাকে, তাই দেয়াল ধসের সম্ভাবনা নেই। আবার যদি তার কার্নিশের কাঠ বা বিম ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলেও সেটা সংস্কারযোগ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বেজমেন্টকে আদ্রতামুক্ত রাখতে পারলে ভবনের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়।

আরবান স্টাডি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকা শহরের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাওগুলোকে অক্ষুণ্ণ রেখে ঢাকাকে তার সনাতন ঐতিহ্যে দাড় করিয়ে রাখতে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *