বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান ২১০০ ও টেকসই উন্নয়ন ভাবনা

মতামত

মোঃ মোশারফ হোসাইন: 

বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ ও প্লাবন ভূমি,যেখানে বেশির ভাগ অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নদী ও সমুদ্র শাসনে প্রভাবিত হয়। প্রতিবছরের বন্যায় এই নদীগুলো আমাদের বিস্তর ভূমিকে উর্বর করে, যা আমাদের অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়াতে বেশ ভালোভাবে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ ও প্লাবন ভূমি, যেখানে বেশির ভাগ অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নদী ও সমুদ্র শাসনে প্রভাবিত হয়। প্রতিবছরের বন্যায় এই নদীগুলো আমাদের বিস্তর ভূমিকে উর্বর করে, যা আমাদের অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়াতে বেশ ভালোভাবে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এর পাশাপাশি প্রতিবছর বাংলাদেশকে তার দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর দিক থেকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে- প্রতিবছর বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবনাক্ততার অনুপ্রবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আরও অনেক ইস্যু মানুষের জীবন-জীবিকাকে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন এ সময়ে খুবই একটি আলোচিত বিষয়, যার প্রভাবের ফলাফল আমরা এখন তিক্ততা নিয়ে প্রতিনিয়ত ভোগ করছি। আর এই কারণেই বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা (Bangladesh Delta Plan)। এর একটা উল্লেখযোগ্য পটভূমি হচ্ছে Sea level riseতথা সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও আমাদের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা। জাতিসংঘ প্রণীত টেকসই উন্নয়নের ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উদ্দেশে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে হলে,বাংলাদেশের ডেল্টা প্লান’র উদ্যোগকে শুরু থেকেই সফলভাবে পরিচালিত করতে হবে। ২০১২ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেদারল্যান্ডস সফর করেছিলেন। এই সফরে বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান পরিকল্পনা ও তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা এবং কীভাবে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে এ রকম একটি বড় প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মাথায় রেখে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া প্রকল্পটি হলো ‘Bangladesh Delta Plan 2100’। এই প্রকল্পের ফলাফল রচিত হবে ৫০ থেকে ১০০ বছরের একটি সমন্বিত এবং টেকসই পরিকল্পনার কাজের উপর ভিত্তি করে। এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য, আমাদের নিরাপদ জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা। এ বিষয়ে অবশ্য ২০১২ সালেই বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গত ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এখন থেকে ৮২ বছরে বাস্তবায়িতব্য‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। অব্যাহত উন্নয়ন অভিযাত্রায় দেশজ এ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং অনুমোদন দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক। নিরাপদ, জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাতসহিষ্ণু সমৃদ্ধশালী ব-দ্বীপ গড়ে তোলাই এ মহাপরিকল্পনার রূপকল্প। দেশ-বিদেশের সংশ্লিষ্ট সকল পেশাজীবী, পরিবেশবিদ, গবেষক,বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদসহ সকল স্তরের অংশীজনের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও উন্মুক্ত মতামত গ্রহণের মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০।

মহাপরিকল্পনা দলিল প্রণয়নের কাজটি দেশজ বিশেষজ্ঞগণের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডস্ বিশ্বে ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনায় সর্বজনস্বীকৃত অদ্বিতীয় একটি দেশ। তাদের কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল ব-দ্বীপ প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ দেশীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিবেচনায় এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করাই যুক্তিযুক্ত বলে অনুভূত হয়েছে এবং সেভাবেই করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও পরবর্তী বাস্তবায়নে ৯টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ যথা: পানিসম্পদ; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ; কৃষি;মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ; খাদ্য; নৌ-পরিবহন; ভূমি এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ সরাসরি যুক্ত ছিল। পানিসম্পদ খাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রত্যক্ষ সহায়তা গ্রহণ করা হয়েছে এবং জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে ২৬ সদস্যের কারিগরি পরামর্শক দল কাজ করেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/প্রতিষ্ঠান হতে ২৫ জন ফোকাল পয়েন্ট (যারা মূলত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের আওতায় মাঠ পর্যায়ে কর্মরত সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন) কর্মকর্তাকে সার্বক্ষণিকভাবে এ পরিকল্পনা প্রণয়নের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত রাখা হয়েছে। খসড়া পরিকল্পনাটি জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ৯টি সেমিনার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ,পেশাজীবী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ,পরিকল্পনাবিদ, স্থানীয় জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের নিকট উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্সটিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশসহ (আইইবি) বিভিন্ন একাডেমিক ও পেশাজীবী পরিষদের সাথে আলোচনাপূর্বক তাদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার অংশীজনের মাধ্যমে মতামত নেওয়া হয়েছে।

এ মহাপরিকল্পনায় ক্রসকাটিং ইস্যুসমূহ (পরস্পর সম্পর্কযুক্ত) বিষয় হলো: টেকসই ভূমি ব্যবহার এবং স্থানিক পরিকল্পনা; কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি এবং জীবিকা; আন্তঃদেশীয় পানি ব্যবস্থাপনা;গতিশীল অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা; সমুদ্র নির্ভর অর্থনীতি (Blue Economy); নবায়নযোগ্য শক্তি এবং ভূমিকম্প যেগুলোর প্রত্যেকটির জন্য প্রয়োজনীয় পৃথক কৌশল ও কারিগরি কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এ পরিকল্পনা প্রণয়নে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সাথে সুষ্ঠু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতসমূহের সমন্বয় সাধন করেছে। একইসাথে, এ পরিকল্পনার সাথে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী তিনটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের সময়সীমা অর্থাৎ ২০৩০ সালকে স্বল্পমেয়াদী হিসেবে বিবেচনা করে এর আওতায় প্রাথমিকভাবে ৮০টি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পসমূহ এ মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত জাতীয় পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট অভীষ্ট, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এবং সর্বোপরি এ মহাপরিকল্পনার মূল ভিত্তি ‘অভিযোজনভিত্তিক ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনা (Adaptive Delta Management)’ নীতির আলোকে বিশ্লেষণ পূর্বক গ্রহণযোগ্য হলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একইসাথে ভবিষ্য মাথায় রেখে‘সবুজ জলবায়ু তহবিল (Green Climate Fund)’সহ অন্যান্য পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিভিন্ন তহবিল হতে অর্থায়ন প্রাপ্তির সুবিধার্থে ৩৪টি প্রকল্প প্রস্তাবকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, উন্নয়ন সহায়তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা,প্রকল্পের সম্ভাব্যতা জরিপ, ইত্যাদি বিষয়ের আলোকে এতে নতুন প্রকল্প সংযোজন এবং বর্তমান তালিকা হতে বিয়োজনের সুযোগ রয়েছে। আর এ কারণেই এটি ফ্লেক্সিবল,অভিযোজনভিত্তিক, পরিবর্তনীয় ও সমন্বিত একটি মহাপরিকল্পনা।

এ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো এ দেশে ‘পানি ব্যবস্থাপনা খাতে গত ৬০ বছরের কর্মকাণ্ডের’পর্যালোচনামূলক সমীক্ষা। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ অভিঘাতের মত বহিরারোপিত এবং আন্তঃসম্পর্কিত বিষয়সমূহকে বিবেচনা করে প্রথমবারের মত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের বিষয়টিকে মূল কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা বর্তমানে এ খাতে বিশ্বব্যাপী কার্যকর কৌশল হিসেবে কারিগরি ও আর্থিক মানদণ্ডে স্বীকৃত। এ কৌশলটিই ‘অভিযোজনভিত্তিক ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনা’। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ সমীক্ষায় পানিসম্পদ খাতে গত ছয় দশকে স্থাপিত বিভিন্ন স্থাপনাসমূহের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব পরিদৃষ্ট হয়েছে। এ খাতে প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অবকাঠামোসমূহ তার পূর্ণ কর্মকাল সচল থাকে না। এজন্যই বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ তে মোট তহবিলের ২৫ শতাংশ ‘পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ’ খাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে এ স্থাপনাগুলো কার্যকর রাখা এবং সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবেশ বা জলবায়ু পরিবর্তনের মাপকাঠির সাথে বাস্তব দিক (যেমন অর্থনৈতিক চলক) সংযোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক অভিঘাত পরিমাপের বিষয়টি ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ তে প্রথমবারের মত বিবেচনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনটি অভ্যন্তরীণ চলক: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য; এবং দুটি বাহ্যিক চলক: প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে বিবেচনা করা হয়েছে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ গ্রহণ না করলে পরিবেশগত ঝুঁকির ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভিত্তি বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পাবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হয়ে ২০১৭ অর্থবছরের প্রায় ৭.২ শতাংশ থেকে ২০৪১ অর্থবছরে এমনকি ৫.৬ শতাংশে নেমে যেতে পারে। মূলধন মজুত এবং জলবায়ু সংবেদনশীল খাতসমূহের সম্ভাব্য উত্পাদন হ্রাস পাওয়ার কারণে মাথাপিছু আয় ২০৪১ অর্থবছরে মাত্র ১০,৫৪০ ইউএস ডলারে পৌঁছাবে, যা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে ১৪,৩৭৭ ইউএস ডলারের চেয়ে ৩,৮৩৭ ইউএস ডলার কম হবে এবং নিম্নমুখী জিডিপি প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান চাহিদা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ গ্রহণ না করলে বাংলাদেশের উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা এবং দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন উভয়ই ব্যর্থ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তে ২০৩০ সালের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে মোট দেশজ (জিডিপি) আয়ের ২.৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে,যা বর্তমানে মোট দেশজ (জিডিপি) আয়ের ০.৮ শতাংশ। ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় এ বরাদ্দ ২.৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নে প্রতিবছর এ পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে।

ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ এর ধারণা অনুযায়ী মোট দেশজ (জিডিপি) আয়ের ২.৫ শতাংশের মধ্যে ০.৫ শতাংশ অর্থায়ন বিভিন্ন উদ্যোগের আওতায় বেসরকারি খাত হতে এবং প্রায় ২.০ শতাংশ সরকারি খাত হতে নির্বাহ করতে হবে। সরকারি খাত হতে প্রাপ্ত ২.০ শতাংশ মোট দেশজ আয়ের মধ্যে প্রায় ০.৫ শতাংশ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় করার পর অবশিষ্ট মোট দেশজ আয়ের ১.৫ শতাংশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় ব্যয় করা হবে।

উল্লেখ্য,বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা খাত খুব অবহেলিত এবং এ ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণও দেশজ আয়ের ০.১ শতাংশের বেশি হবে না। ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না করা হলে পানিসম্পদ খাতে বিদ্যমান অবকাঠামোর স্থায়িত্বের দ্রুত অবনতি ঘটবে এবং পরবর্তীতে এ সকল অবকাঠামো অধিক ব্যয়ে পুনঃনির্মাণ করতে হবে। অর্থায়নের উত্স হিসেবে বাংলাদেশ সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, পরিবেশ এবং জলবায়ু সম্পর্কিত তহবিল বিশেষ করে Green Climate Fund,সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি),প্রভৃতিকে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে Cost Recovery-র জন্য ক্রমান্ব্বয়েBeneficiary Pay Principle, Polluter Pay Principle নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।

বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিষয়ের অন্যতম হলো ‘আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনা’। এ অধ্যায়ে উজানের নদীসমূহে পানি ব্যবহারের বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। উজানের পানি প্রবাহের বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় রেখে সংশ্লিষ্ট দেশের সাথে সমঝোতার ভিত্তিতেউপযুক্ত স্থান নির্বাচনপূর্বক প্রয়োজনে দেশের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য বাঁধ বা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয় বিবেচনা; পানিসংক্রান্ত কূটনীতির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধান এবং সংঘাত প্রতিরোধ; তিস্তাসহ অন্যান্য সকল আন্তঃদেশীয় নদীর পানি বন্টন সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদন তত্পরতা অব্যাহত রাখা; চাহিদাভিত্তিক যৌথ নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ; পানিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষকে (বহুপক্ষীয় বা দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বা দেশ) সম্পৃক্তকরণ; অববাহিকাভিত্তিক বন্যা পূর্বাভাস পদ্ধতির উন্নয়ন; এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমঝোতার মাধ্যমে উজানের নদীসমূহের বিস্তর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং তা বিচার বিশ্লেষণের মত বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ পরিকল্পনায় ‘ব-দ্বীপ বিষয়ক জ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ গড়ে তোলার বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লব্ধ ডেল্টা সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক জ্ঞান সংকলন করে একটি ডিজিটাল নলেজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা; ডেল্টা উপাত্ত ব্যাংক স্থাপন, সমন্বিত ডেল্টাবিষয়ক জ্ঞান এবং উপাত্ত সংগ্রহ,হালনাগাদকরণ এবং প্রয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ মহাপরিকল্পনায় নদী খনন ও শীতকালের জন্য বর্ষা মৌসুম শেষে পানি সংরক্ষণাধার তৈরির ব্যাপক প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে।

সদ্য অনুমোদিত ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ একটি অভিযোজী এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হওয়ায় এটিকে দেশের পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার সাথে সমন্বিত করা হবে। এ পরিকল্পনা সময়ে সময়ে এবং নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হবে এবং পরবর্তী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাসমূহে তার প্রতিফলন থাকবে। এ পরিকল্পনার আরো সমৃদ্ধির জন্য তাতে নতুন জ্ঞান এবং প্রযুক্তির সমাবেশ ঘটানো হবে। ভবিষ্যতে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হবে প্রতিনিয়ত পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন।

বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’র সফল বাস্তবায়নে দৃঢ়, সমন্বিত ও সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল কার্যকরী কৌশল অবলম্বন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ন্যায়সঙ্গত সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দেশের নদী ও পানিসম্পদের সর্বোচ্চ ও যথোপযুক্ত ব্যবহার; সমন্বিত ও টেকসই নদী ও নদীর মোহনা গড়ে তোলা; খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন অভিঘাত এবং অন্যান্য ব-দ্বীপ সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

নেদারল্যান্ডস বিশেষজ্ঞ দল বেশ ভালভাবেই এ ধরনের কাজে দক্ষ। তাছাড়া, পানি বাবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বিশ্বজোড়া অনন্য এক স্বীকৃতি পেয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান থেকে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস দুই দেশই উপকূলবর্তী ও বন্যাপ্রবণ। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে,পানি অব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশে প্রতিবছর অনিয়ন্ত্রিত বন্যা হয়। আর নেদারল্যান্ডস এ ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনার ফলে বন্যা থেকে সুরক্ষিত থাকে। একইসঙ্গে ডাচরা নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহও করে থাকে দারুণভাবে। নেদারল্যান্ডস সরকার ১৯৫৩ সাল থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে তাদের ডেল্টা প্লানকে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে গেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রায় ৬০ বছর পরে এসেও ডাচরা দেখছে তাদের ডেল্টা প্লান মূলত টেকসই উন্নয়নের একটি উদ্যোগ মাত্র, কিন্তু তারা শতভাগ সফল হতে পারেনি (৮০ ভাগ সফল)।কারণ হিসেবে তারা প্রধানত জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছে। তারা বলছে, তাদের এই টেকসই পরিকল্পনার উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরেও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতি বৃষ্টি ও তাপমাত্রার বৃদ্ধির পরিবর্তন তাদের সফল কার্যক্রমকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। তাই এসব সমস্যা এখন আমলে নিয়ে ডাচরা তাদের ডেল্টা প্লানকে নতুনভাবে সাজানোর চিন্তা করছে। এই বিষয়ে ডাচ ডেল্টা কমিশন আটটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছে। বিষয়গুলো হলো- পানি, বসত, কাজ ও নিয়োগ, চিত্ত বিনোদন,কৃষি, প্রকৃতি, অবকাঠামো (গণপূর্ত) এবং স্থানিক (Spatial) পরিকল্পনা। তবে সবকিছুর মূলে ডাচ পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য দু’টি- ১) বন্যা নিয়ন্ত্রিত দেশ এবং ২) নাগরিকদের পর্যাপ্ত সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা। এখন বাংলাদেশ ডেল্টা প্লানের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে আরও সুপরিকল্পিতভাবে সমন্বিত করা প্রয়োজন। এখনকার ডেল্টা পরিকল্পনায় প্রধানত নদী শাসন ও খাদ্য নিরাপত্তাকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবসম্মত টেকসই উন্নয়নের মূলনীতি বিশ্লেষণ করলে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকেও এই প্রকল্পের আওতায় আনতে হবে। সম্ভাব্য সকল সাধারণ সুবিধাভোগীদের এই প্রকল্পের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করানো টেকসই উন্নয়নের একটা অন্যতম ধারাবাহিকতা। কিন্তু কেবল নদী খনন আর বন্দর উন্নয়ন করলে এই ডেল্টা প্লানের মূল কাজে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়তে হবে। আরও সমন্বয় করতে হবে।

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বি.এসসি. (অনার্স), এম.এস. (মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এম. এসসি. (পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *