জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম: অন্তরালের কিছু কথা

মতামত

মো. মোশারফ হোসাইন:

পরাধীন ভারতে সবাই যখন ব্রিটিশরাজের আনুগত্য প্রকাশ করে ভারত বিধাতা হিসেবে মেনে নেয় তখন আবির্ভাব ঘটে কবি নজরুলের (১৮৯৯-১৯৭৬) বিদ্রোহী সত্ত্বার। সবাই যখন নরম সুরে কোমল কথায় ব্রিটিশদের গুণগান করে তখন কবি নজরুল বজ্রকন্ঠে পরাধীনতার শৃংখল ভাঙ্গার জন্য ভারতবাসীকে আন্দোলিত করে।

চিরদুখী কবি নজরুল খুবই অল্প বয়সে বাবাকে হারান মায়ের আদরও ঐভাবে পাননি। তার পিতা কাজী ফকির আহমদ (মাত্র ষাট বছর বেঁচে ছিলেন) সুপুরুষ ছিলেন। ফকির সাহেব পিতার ওয়ারিশ সূত্রে প্রায় চল্লিশ বিঘার মতো চাষের জমি পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ বয়সে এক বসত বাড়ী ছাড়া তার বিষয় সম্পত্তি বলতে কিছুই ছিল না। এ বিষয় সম্পত্তি হাত ছাড়া হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পাশা খেলা। এই খেলা তাকে প্রবলভাবে পেয়ে বসেছিল। কবি নজরুলের মায়ের নাম জাহেদা খাতুন (তিনি ফকির আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন)। কবির মা উচ্চ বংশজাত ও অতি দয়াবতী রমণী ছিলেন। জাহেদা খাতুনের গর্ভে তিনপুত্র এবং এক কন্য সন্তানের জন্ম হয়। কাজী সাহেবজান, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী আলি হোসেন ও বোন উম্মে কুলসুম।

কাজী নজরুল নানা কারণে কিশোর বয়সেই গৃহত্যাগ করছিলেন। এরপর মায়ের সাথে তার দেখা হয় দীর্ঘ প্রায় দশ বছর পর। যখন তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সরাসরি গ্রামের বাড়ি চুরুলিয়ায় যায়। এ সময় মায়ের সাথে তার নানা বিষয়ে অনেক আলাপ হয়। শেষে কথায় কথায় ভীষণ ঝগড়া বেধে যায়। এই ঝগড়ার কারণ জানা যায়নি। নজরুলও পরবর্তীতে এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলেননি। ঝগড়ার পর তিনি বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। এরপর তার মা যতদিন জীবিত ছিলেন কত অনুরোধ করেছেন, কত আবদার ধরেছেন ছেলেকে একনজর দেখার জন্য কিন্তু নজরুলের জেদ আর অভিমান এতটা তীব্র ছিল যে, মায়ের অনুরোধ তিনি রাখেননি। ইহকালে মায়ের আর ছেলের মুখ দেখা হয়নি। শোনা যায় নজরুলের মা জাহেদা খাতুন ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। সে সময় তার বয়সও ছিল কম। একজন কম বয়স্ক সুন্দরী বিধবা রমণী সম্মানের সঙ্গে নিজের ইজ্জত আব্রু রক্ষা এবং নিজের ও সন্তানদের ভরণ পোষণের নিশ্চয়তার জন্য যদি মৃত স্বামীর ভাইকে বিয়ে করেই থাকেন তাহলে অবস্থার প্রেক্ষাপটে সেটাকে কোনো অন্যায় বলা চলে না । তা’ ছাড়া ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের বিয়েকে বরং উৎসাহিতই করা হয়েছে। তবে একথা মিথ্যা নয় যে, উভয় বঙ্গের গ্রামীণ পরিবেশের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা এতটা অনুদার যে, সম্পূর্ণ বৈধ হলেও এ ধরনের বিয়েকে অনেকে কিছুটা হেয় চোখেই দেখে থাকে। সম্ভবত নজরুলও সেই মানসিকতার ঊর্ধ্বে উঠে মায়ের দ্বিতীয় বিয়েকে মেনে নিতে পারেননি (তথ্য সূত্র: নজরুল গবেষক জোবায়ের আলী জুয়েল)।

এমনও হতে পারে, নজরুলকে তার মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে কেউ হাসি মশকরা করেছিল, যা তার শিশু মনে গেঁথে গিয়েছিল এবং যা তিনি কখনোই ভুলতে পারেননি। মা’ জাহেদা খাতুন পুত্র নজরুলকে এক নজর দেখার জন্য অন্তিম বাসনা প্রকাশ করেছিলেন। জাহেদা খাতুনের মাতৃ হৃদয়ের এই অতৃপ্ত হাহাকার কি নজরুল জীবনে কোনোই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেনি? কে জানে নজরুলের ৩৪ বছরের জীবন্ত-মৃত অবস্থার জন্য তার মায়ের অতৃপ্ত আত্মার অভিশাপই দায়ী কি-না। জীবদ্দশায় কবি কখনোই এ সম্পর্কে মুখ খোলেননি। নিজ মায়ের সাথে তিক্ত সম্পর্ক থাকলেও নজরুলের ‘মা’ সম্বোধনে যারা ধণ‍্য হয়েছিলেন তাদের মধ্যে দৌলতপুরের আলী আকবর খানের মেজো বোন নার্গিসের খালা আম্মা এখতারুন্নেসা খানম, বিপ্লবী হেমপ্রভা দেবী, হুগলির মিসেস এম রহমান, কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবী এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবী অন্যতমা।

সাম‍্যের কবি নজরুলের সাথে প্রমীলা সেনগুপ্তের বিয়ে হয় ১৯২৪ সালে। নার্গিসের সাথে কবি নজরুলের বিয়ে নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে এই নিয়ে কিছু বলতে চাইনা। বিয়ের সময় প্রমীলার বয়স ১৪ আর নজরুলের ২৩, যদিও বর্তমান পেক্ষাপটে তা বাল্যবিবাহ। প্রমিলার সাথে কবির বিয়ে হয়েছিল মুসলিম রীতিমতো যদিও প্রমীলা ব‍্যতীত তার পরিবারের অন্য কেউ মুসলমান হয়নি। কবির শাশুড়ির গিরিবালা দেবী ছিলেন ব্রাহ্মণের মেয়ে। কবি তাকে অনেক সম্মান করতেন এবং একটা সময় কবির পরিবারের সাথেই তিনি থাকতেন। একই পরিবারে হিন্দু-মুসলমানের বসবাস এর চেয়ে বড় সাম্য আর কতজন দেখিয়ে গেছেন।

বিদ্রোহী কবি নজরুল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। তিনি ছিলেন তুখোড় কংগ্রেসী। কংগ্রেসের বিভিন্ন কর্মী সম্মেলনে তার সরব উপস্থিতি এবং জ্বালাময়ী বক্তব্য আজকে আমরা প্রবন্ধ সাহিত্য হিসেবে পাই। আন্দোলন করতে গিয়ে কবির জেল খেটেছেন নানা অত্যাচার- নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তবুও নিজের ধ্যান-ধারণা চিন্তা-চেতনা থেকে কখনো পিছপা হননি। কংগ্রেসের রাজনীতি করলেও কবির সাথে মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের ছিল খুবই সুসম্পর্ক। মুসলিম লীগের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কে তিনি খুবই সম্মান করতেন। কবির ধর্মাচরণ নিয়ে নানা জন নানা মন্তব্য করে থাকে। তবে তিনি অনেক সুন্দর সুন্দর গজল লিখেছেন। হিন্দুদের জন্য কবি শ্যামাসঙ্গীত লিখলেও নিজের মুসলমানিত্ব কখনো জলাঞ্জলি দেননি। ভালো করে অনুধাবন করলে দেখতে পাই তার কোন লেখাতেই ইসলামের সাথে সংঘাতপূর্ণ কোন কিছু নেই। যদিও বর্তমানে এক শ্রেণীর তথাকথিত কবি-সাহিত্যিকেরা ইসলামের বিরুদ্ধে লিখে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণের চেষ্টা করেন। কবি নজরুল শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (স.), অন্যান্য নবী ও সাহাবী গণকে খুব সম্মান করতেন এবং সম্মান দিয়ে লেখা লেখি করতেন। কবি নজরুল বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন। তার সংকল্প কবিতা যখন আমরা পড়ি দেখতে পাই কবি ঘরে বসেই বিশ্বের খবর জানার চেষ্টা করছেন। বিংশ শতকের সেই প্রথমদিকে তা অকল্পনীয় হলেও বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটে প্রযুক্তির ধারণা কিন্তু নজরুলের এ সংকল্প কবিতা দেয়। কবি বলেছেন,,,
“থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগৎটাকে কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে”

এখনো কি আর কেউ ঘরে থাকতে চায়, নারী-পুরুষ সবাই কাজের পিছনে ছুটছে, আর এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। নারী নিয়ে কবির অম্ল-মধুর দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে। তিক্ত অংশটুকু না বলে আমরা মধুর কথাটাই বলি। কবির মতে মহাবিশ্বের সকল অগ্রগতির পেছনে নারীর অবদান রয়েছে। যদিও সকল অকল্যাণে কোন না কোনভাবে নারীর অংশগ্রহণ পাওয়া যায়। আমরা কল্যাণের বাণীই প্রচার করব।আধুনিক যুগে বসবাস করে আমরা এ বোধই হৃদয়ে লালন করব।

আজকের এ দিনে কবি নজরুল ইসলাম পৃথিবীতে এসেছিলেন। মহান সৃষ্টিকর্তা তাকে অনেক জ্ঞান প্রজ্ঞা দিয়েছিলেন। কবিকে আল্লাহ দীর্ঘায়ু দিলেও লেখালেখি করতে পেরেছিলেন মাত্র চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত। পুরোটা জীবন লেখালেখি করতে পারলে হয়ত কবির কাছ থেকে আমরা আরো অনেক কিছু পেতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে কবি অন্তিম শয্যায় শায়িত আছেন। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তাই বিভিন্ন কাজে-অকাজে শাহাবাগ যেতাম, গেলেই কবির মাজারের পাশে নিরবে দাঁড়িয়ে মহান সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতাম। আজকের রমজানের এ দিনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি হে আল্লাহ আপনি কবিকে পরকালে শান্তিতে রাখেন।

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

Spread the love

2 thoughts on “জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম: অন্তরালের কিছু কথা

  1. গোজানো, সাজানো আপনার এই প্রাঞ্জল লেখাটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি।
    কবি নজরুল সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পারলাম,,,, অসংখ্য ধন্যবাদ, ভাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *