ক্ষমা করো মুক্তামনি

মতামত

শামসুল হক:

বুধবার (২৩ মে) সকাল বেলায় ঘুম থেকেই উঠেই তোমার মৃত্যুর সংবাদটি চোখে পড়লো। ভালো থাক পরপারে। সুখেই থাক। আমাদের ক্ষমা করো তুমি। অকালেই তোমাকে নিয়তির কাছে হার মানতে হলো। হ্যাঁ সত্যিই এই পৃথিবী তাকে কিছু দিতে পারলো না। সবার সামনেই ছোট এই ফুটফুটে শিশুটিকে বিদায় নিতে হলো। হ্যাঁ এতোক্ষণ যার কথা বলা হচ্ছিল সেই সাতক্ষীরায় বিরোল রোগে আক্রান্ত মুক্তামনির কথা।  বুধবার সকাল ৭টার দিকে সদর উপজেলার কামারবায়সা গ্রামের নিজ বাড়িতেই মৃত্যু হয় ১২ বছর বয়সী শিশুটির।

মুক্তামনির বাবা ইব্রাহিম হোসেন জানান, গত কয়দিন ধরেই মুক্তার অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। আজ ভোরে বমি শুরু হয়। একবার পানি খেতে চাইল। ওর দাদি গেল পানি আনতে। পানি আনতে আনতে সব শেষে।

মুক্তামনির হাতের যখন অপারেশন চলে। তখন মুক্তামনিকে বলা হয়েছিল, তুমি আবার সুস্থ হবে। আবার স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে। মুক্তামনি সেই সময় সাংবাদিকদের বলেছিল, আমি সুস্থ হয়ে আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে চাই। আমি আবার স্কুলে যেতে চাই। বড় হয়ে দেশের মানুষের সেবা করতে চাই। মুক্তামনির সেই আশা পূরণ হলো না। সেই আশা অপূর্ণই থেকে গেলো। এই পৃথিবীর আলো-বাতাশে হেসে খেলে বেরে উঠা হলো না আর তার।

জানা গেছে, তার চিকিৎসায় ত্রুটি ছিল না। যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই তার চিকিৎসার ভার নিয়েছিলেন। সবাই প্রায় সবাই আশা করেছিল মুক্তামনি সুস্থ হবেন। তার চিকিৎসার জন্য বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। এক অর্থে বলা যায়, তার চিকিৎসার ত্রুটি ছিল না।

মুক্তামনির চিকিৎসা বোর্ডের অন্যতম ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।। তার মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর তিনি জানান, মুক্তামনির মৃত্যু আমার জন্য হার্ট ব্রেকিং খবর।

তিনি আরও বলেন, জীবনে বহু রোগীর চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছি, আবার বহু রোগীর মৃত্যুও দেখেছি। কিন্তু মুক্তামনির মৃত্যু আমার জন্য হার্ট ব্রেকিং খবর। ছোট্ট এ শিশুটির ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।

তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরেই মুক্তামনির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকায় নিয়ে আসতে বলে আসছিলাম। গতকালও সাতক্ষীরার সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা বলে দুজন চিকিৎসককে তাদের বাড়িতে পাঠাই। বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসকরা জানায়, মুক্তামণির শারিরিক অবস্থা খুবই খারাপ। হাতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মারাত্মক (হিমোগ্লোবিনের অভাব) রক্তশূন্যতায় ভুগছে।

তখন মুক্তামনির বাবাকে বলি, ঢাকায় না হউক অন্তত সাতক্ষীরা হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু তার বাবা রাজি হয়নি। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘স্যার, অনেক তো চেষ্টা করেছেন। ভাগ্যে খারাপ- ভালো হয় নাই। এখন মেয়েটা অনেক কষ্ট পাইতাছে। আর টানাহেঁচড়া করতে চাই না। আল্লাহর হাতে ছাইড়া দিছি। মরলে বাড়িতেই মরুক। আর আজ সকালেই তার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হলো।

গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুক্তামনিকে রিলিজ নিয়ে বাড়িতে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার তাকে ঢাকায় আসতে বলা হলেও মুক্তামনি রাজি হয়নি। সম্প্রতি তার শারিরিক অবস্থার অবনতি হয়।

মুক্তামনির হাত আগের থেকে কয়েক গুণ ফুলে যায়। ব্যান্ডেজ খুলে পরিষ্কার করার সময় হাত থেকে বেরিয়ে আসছিল বড় বড় পোকা।

এর আগে ঢামেক ভর্তি করা হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেখানকার চিকিৎসকরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মুক্তামনির হাত দেখে আঁতকে ওঠেন। একইসঙ্গে হাত অপারেশনের জন্য অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা দেশেই অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কয়েক দফা অপারেশনও করেন। তবে হাতের কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি।

অবশেষে দীর্ঘ ৬ মাস চিকিৎসা সেবার পর এক মাসের ছুটিতে বাড়িতে আসে মুক্তামনি। তবে পরবর্তীতে মুক্তামনি আর ঢাকায় যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। একইসঙ্গে মুক্তামনির অবস্থার পরিবর্তন না হওয়ায় ঢাকায় যেতে নিরুৎসাহী হয়ে পড়ে তার পরিবারও।

আধুনিক এই যুগে সবক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে বলে প্রতীয়মান। অনেক বড় বড় অপারেশন করা হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি এতো ব্যাপক আকারে হয়েছে যে তা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু এই ছোট ফুটফুটে শিশুটি ধুকে ধুকে মারা গেলো। বাঁচার আকুতি রেখে। উন্নত এই চিকিৎসা বিজ্ঞান তার ক্ষেত্রে ব্যর্থ। তাকে বাঁচাতে পারলো না। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নতমানের চিকিৎসা যদি সে পেতো হয়তো বা সেরে উঠতো। ছোট এই শিশুটি বুঝতে পেরেছিল সে পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে। তাইতো শেষ সময় আপন আলয় থেকে বের হতে চাননি।

প্রশ্ন হচ্ছে দেশে দেশের বাইরে এতো উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেনো তাকে ওই নিভৃত পল্লীতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। তাকে বার্ন ইউনিটে কি রাখা যেতো না? যাতে বিশেজ্ঞ চিকিৎসকরা সব সময় দেখে রাখতে পারতেন। দীর্ঘ ছয়টি মাস ওই পল্লীতে থাকতে হয়েছে তাকে। এতে হয়তো শিশুটি ধরেই নিয়েছিল সে আর বাঁচবে না। এক প্রকার নিয়তির কাছেই আত্মসমর্পণ করেছিল।

তাই তো এই পৃথিবীর কাছে প্রকাশ্যে তার কোনো ক্ষোভ ছিল না। হয়তো মনের মধ্যে ক্ষোভ ছিল আমি কেনো সুস্থ হবো না। এই পৃথিবীর আলো-বাতাশ আমি কেনো আরও বেশি দিন উপভোগ করতে পারবো না। কেনো এতো দ্রুত আমাকে বিদায় নিতে হবে। হয়তো এমন প্রশ্ন মুক্তামনির মনে জেগেছিল।

ক্ষমা করো মুক্তামনি। তোমাকে এই পৃথিবী সেই সুখ থেকে বঞ্ছিত করলো। তুমি হয়তো মন থেকে চেয়েছিলে আরও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি হোক। যাতে তোমার মতো কাউকে এভাবে চলে যেতে না হয়।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মুক্তামনি ঢাকায় আসতে চায়নি। তার পরিবারও তাকে আর ঢাকায় নিয়ে আসতে চায়নি চিকিৎসার জন্য। কিন্তু তাকে কি আর ঢাকায় আনা যেতো না। তার জন্য আরেকবার কি ভাবা যেতো না। তার চিকিৎসায় যদি সফলতা  আসতো তাহলে চিকিৎসা বিজ্ঞান নতুন এক আর এক দ্বার উন্মোচন করতে পারতো। সে চেষ্টার ত্রুটি কি ছিল না? সব শেষে একটিই প্রার্থনা ভালো থাক মুক্তামনি পরপারে।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে ইব্রাহিম গাজি ও আসমা দম্পত্তির ঘরে দুটি যমজ সন্তান জম্মগ্রহণ করে। আদর করে নাম রাখা হয় হীরামনি ও মুক্তামনি।

লেখক: সাংবাদিক।

Spread the love