কবি আল মাহমুদ: এক যুগের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন

মতামত

মো. মোশারফ হোসাইন:

ইতিহাস আজীবন কথা বলে। ইতিহাস মানুষকে ভাবায়, তাড়িত করে। প্রতিদিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা কালক্রমে রূপ নেয় ইতিহাসে। সেসব ঘটনাই ইতিহাসে স্থান পায়, যা কিছু ভালো, যা কিছু প্রথম, যা কিছু মানবসভ্যতার অভিশাপ-আশীর্বাদ। কবি আল মাহমুদ আজ ইতিহাসের অংশ, তিনি পাড়ি জমিয়েছেন এই মর্ত্য লোক থেকে। আজ জানার চেষ্টা করি এই আধুনিক কবিকে নিয়ে।

কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। কবি দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন৷ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শরীর বেশি খারাপ যাওয়ার ফলে কিছুদিন আগে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়৷ রাত দশটার দিকে লাইফ সাপোর্ট দেয়া হয়েছিল তাকে, কিন্তু শেষমেষ ইবনে সিনা হাসপাতালে, গতকাল রাত (ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৯) এগারোটা পাঁচ মিনিটে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন কবি৷

আল মাহমুদ ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাকভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় অবলম্বন করেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি।

আল মাহমুদ কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলের পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আজীবন আত্মপ্রত্যয়ী কবি ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা করে একের পর এক সাফল্য লাভ করেন। সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন ১৯৫৪ সালে। এই বছর থেকেই অর্থাৎ ১৮ বছর বয়স থেকে তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। এ সময় তিনি পত্রিকায় কাজ নেন ও সাহিত্যে পুরোদমে মনযোগী হন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র/পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর(১৯৬৩) সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস(১৯৬৬),সোনালি কাবিন(১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো(১৯৬৯) কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে মাত্র দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম সোনালি কাবিন। কবি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন।

Mosharof

১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ পানকৌড়ির রক্ত প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস কবি ও কোলাহল। আল মাহমুদ সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং যুদ্ধের পরে দৈনিক গণকণ্ঠ নামক পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। এই পত্রিকায় সামসুদ্দিন পেয়ারা, মরহুম আসফউদ দৌলা, ফজলুল বারী প্রমুখ রিপোর্টার হিসাবে কাজ করেন। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী সময় এক বছরের জন্য একবার জেল খাটেন । পরে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু তাকে শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

ধার্মিক পরিবারের সন্তান কবি আল মাহমুদ প্রথম জীবনে বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং তার লেখায় অবাধ যৌনতা প্রকাশ পেত। ১৯৯০-এর দশক থেকে তাঁর কবিতায় বিশ্বস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস উৎকীর্ণ হতে থাকে। কবি এসময় নিয়মিত নামাজ পড়তেন এবং নিজেকে ধর্ম কর্মে জড়িয়ে রাখতেন। বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে কবি তার প্রথম জীবনের কার্যকলাপের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং তিনি যে ভুল পথে ছিলেন তা অকপটে স্বীকার করেছেন। ধর্মের পথে ফিরে আসার কারণে কবি কথিত একদল প্রগতিশীলদের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তবে ঈশ্বরানুগত্যের কারণে তার কবিতার কাব্যগুণ আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি কখনো। প্রিয় কবি ভালো থাকবেন পর পারে, মহান সৃষ্টিকর্তা আপনাকে জান্নাত দান করুক এই কামনা করছি।

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বি.এসসি. (অনার্স), এম.এস. (মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এম. এসসি. (পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *