উচ্চচাপ, নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির রহস্য জানেন কি?

মতামত

মো. মোশারফ হোসাইন:

এই সময়টাতে প্রায়ই শোনা যায়, বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে, এ নিম্নচাপ থেকে উচ্চশক্তিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত আনতে পারে এবং এতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে। কিভাবে সৃষ্টি হয় ঘূর্ণিঝড়? নিম্নচাপ উচ্চচাপ জিনিসটাইবা কী? এগুলো দেখতে লম্বা না গোল? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET) থেকে Water Resource Development এ মাস্টার্স করতে গিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উপরে বেশ কয়েকটি কোর্স পড়েছিলাম। সেই অর্জিত জ্ঞানের আলোকেই চেষ্টা করব ঘূর্ণিঝড় বিশেষ করে বাংলাদেশের সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে কিছু গতানুগতিক কথাবার্তা বলতে।

দিনের বেলা সূর্য তাপের কারণে স্থল ভাগ জল ভাগ থেকে উষ্ণ থাকে। উষ্ণ স্থলভাগ তার উপরে থাকা বাতাসের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। বায়ু উষ্ণ হলে তা হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় ফলে ওই স্থান ফাঁকা হয়ে নিম্নচাপের সৃষ্টি করে। অপরদিকে সমুদ্রের উপরের বায়ু স্থলভাগ থেকে ঠাণ্ডা হওয়ার কারণে তা ভারী হয়ে নিচে নেমে আসে। এর ফলে সমুদ্রের উপর বায়ুচাপ বেড়ে যায়। নিম্নচাপ অঞ্চলের গরম বায়ু হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এর ফলে সৃষ্ট ফাঁকা স্থান পূরণের জন্য উচ্চচাপ অঞ্চলের শীতল বায়ু নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। রাতে স্থলভাগ সমুদ্রের তুলনায় ঠান্ডা থাকে তাই তখন স্থলভাগে বায়ুর উচ্চচাপ এবং সমুদ্রে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়।

বর্ণিত কথা গুলোকে যদি আরো সহজ করে বলা হয় তাহলে দাঁড়ায়, কোনো স্থানে বায়ুর তাপ বৃদ্ধি পেলে সেখানকার বায়ু উপরে উঠে যায়। ফলে বায়ুর চাপ ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়, একে নিম্নচাপ বলে। এ নিম্নচাপ অঞ্চলে প্রায় বায়ুশূন্য অবস্থা থাকে বলে আশপাশের অঞ্চল থেকে বায়ু প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে ছুটে আসে। এ নিম্নচাপ কেন্দ্রমুখী প্রবল ঘূর্ণি বায়ু প্রবাহকে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন বলে। ঘূর্ণিঝড় একটি সামুদ্রিক দুর্যোগ। কোথাও সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উত্তপ্ত হয়ে গেলেই ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় যেখানে উৎপত্তি হয় সেখানে ১০-৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ব্যাসার্ধে তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে এবং বায়ুর গতিবেগ খুব কম থাকে। এখানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম। এ অঞ্চলটিকে বলে ঘূর্ণিঝড়ের চোখ। এর বাইরে ১৫০-৭৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত ব্যাসার্ধে ঘূর্ণিঝড় বিস্তৃত হতে পারে এবং সেখানেই ঘণকালো মেঘের বিস্তার ও প্রবল বায়ুর প্রবাহসহ বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়াগত গোলযোগ সংঘটিত হয়। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সময় অতিরিক্ত উষ্ণতা থেকেই জন্ম নেয় বাষ্প ও স্যাঁতস্যাতে বাতাস। সেটিই একসময় ভয়ঙ্কর কালো মেঘে পরিণত হয়। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের দুই দিক থেকে আসা নিচের এই বাতাস এক হয়ে গরম পানির উপরের বাতাসকে ঠেলে দেয় আরও উপরের দিকে। তখন তাদের জায়গা করে দিতেই, অর্থাৎ এদের ধাক্কায় উপরের বাতাস ধেয়ে যায় উল্টো দুই দিকে। উপরের দিকে উঠতে থাকা ভেজা বাতাস এরই মাঝে তৈরি করতে থাকে ঝড়ো মেঘ। আর এই ঘটনার আশপাশে বয়ে চলে যে হাল্কা বাতাস, সেও বাইরে থেকে ধীরে ধীরে এই ঘনঘটার ভেতর ঢুকতে শুরু করে, এতে ঝড়ের ঘূর্ণি আরও বড় হতে থাকে। বাতাসের গতি যখন প্রতি ঘণ্টায় ১১৮ কিলোমিটারের বেশি হয়ে যায়, তখনই তাকে প্রবল ঘূর্ণিঝড় বলা হয়। গতি যখন এর চেয়ে কম থাকে কিন্তু প্রতি ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটারের বেশি থাকে তখন সেটা শুধুই মৌসুমী ঝড়।

বাংলাদেশে বর্ষাকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু এবং শীতকালে উত্তর পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। বর্ষাকালে অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট মাসে বাংলাদেশের স্থল ভাগ বঙ্গোপসাগরের থেকে উষ্ণ থাকে। শীতকাল অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের স্থল ভাগ বঙ্গোপসাগর থেকে শীতল থাকে। স্থল ভাগের এই বিপরীত অবস্থায় বাংলাদেশের বায়ুর উচ্চচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি হয় বঙ্গোপসাগরের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের দেওয়া তথ্য মতে, প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরে গড়ে ১৩-১৪টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় (বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটারের কম) সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে ৫টি ঘূর্ণিঝড় শক্তি অর্জন করে এবং পাশ্ববর্তী উপকূল অতিক্রম করে। এদের যেকোনোটিরই বাংলাদেশের উপকূলের দিকে ঘুরে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এবার নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের শ্রেণি ভাগটা দেখে নেওয়া যাক। বাতাসের তীব্রতা ও গতির ভিত্তিতে এদেরকে নিম্নোক্ত শ্রেণিতে বিভাজন করা হয়।

১. নিম্নচাপ: বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২০ থেকে ৫০ কিলোমিটার।
২. গভীর নিম্নচাপ: বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫২ থেকে ৬২ কিলোমিটার।
৩. ঘূর্ণিঝড়: বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৭ কিলোমিটার।
৪. প্রবল ঘূর্ণিঝড়: বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮৯ থেকে কিলোমিটার।
৫. হারিকেনের তীব্রতা সম্পন্ন প্রবল ঘূর্ণিঝড়: বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটারের ঊর্ধ্বে।

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ নিয়ে কিছু কথা বলে আজকের লেখার সমাপ্তি টানতে চাই। ইদানিংবিভিন্ন সুন্দর সুন্দর নামের ঘূর্ণিঝড়ের নাম শুনতে পাওয়া যায়। যেমন, বাংলাদেশ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’। কিছুদিন আগেই এমন খবর শুনেছেন সবাই। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যে ঝড়টি ভয়ঙ্করভাবে আঘাত হানে তার নাম ছিল সিডর অর্থাৎ চোখ। আর এই নামটি দিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। ২০০৮ সালে নার্গিস নামে যে ঘূর্ণিঝড়টি মিয়ানমার উপকূলে আঘাত হানে সেই নামটি দিয়েছিল ভারত। এভাবে ইচ্ছা করলেই যে কোনো দেশ যেকোনো একটা নাম দিয়ে ফেলবে আর সবাই সেটা মেনে নিবে এটা কী করে হয়?

সমুদ্রে সৃষ্ট ঝড়ের নামকরণের জন্য বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) বিভিন্ন আঞ্চলিক কমিটি তৈরি করেছে সমুদ্রের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। যেমন উত্তর ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সব ঝড়ের নামকরণ করবে WMO-এর ৮টি সদস্য রাষ্ট্র বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যাণ্ড ও ওমান। এদের একত্রে ‘স্কেপে’ বলা হয়। পূর্বে ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের ঝড়গুলোর নাম হতো সন্তদের নামে। যেমন সান্তা আনা, স্যান ফেলিপ (১ম), স্যান ফেলিপ (২য়)। এরপর ঝড়ের নামকরণ করা হতো অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মানুষের কাছে এসব নাম একটু বেশিই জটিল শোনায়। তাত্ত্বিক এসব নামের চেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট নামকরণ লিখিত বা মৌখিক যেকোনো যোগাযোগে অধিকতর সহজ। ফলে এ ধরনের নাম ব্যবহার যুক্তিযুক্ত। যেমন এত ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও এত ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের ঝড়টি এখন বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে বলার চেয়ে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ ধেয়ে আসছে বলা অনেক সহজ এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে দ্রুত সহায়ক। তাই ২০০০ সালে স্কেপের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রতিটি দেশ থেকে দশটি করে নাম জমা নেওয়া হয় ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করার জন্য। এখান থেকেই পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণ করা হয়। পূর্ব নির্ধারিত নামের তালিকা থেকে একেকটি ঝড়ের নাম দেওয়া হয়। ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আবহাওয়াবিদরা অধিকাংশ ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করেছেন মেয়েদের নামানুসারে। যেমন ক্যাটরিনা, নার্গিস, সিডর, রেশমি, বিজলি। তবে ঝড় যেহেতু মৃত্যু ও ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত, তাই কোনো নাম পুনরায় ব্যবহার করা হয় না।

লেখক: সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

Spread the love

2 thoughts on “উচ্চচাপ, নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির রহস্য জানেন কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *