আমরা চলচ্চিত্র কেন দেখবো? কেন দেখবো না!

বিনোদন

লাবনী আকতার:

আমরা চলচ্চিত্র কেন দেখবো? কেন দেখবো না! দেখা যায়, বিগত ৫০ বছরে ভিজুয়াল জগতে যে কয়টি শিল্পমাধ্যম প্রসার ও বিকাশ লাভ করেছে তার মধ্যে অন্যতম কার্যকর ও শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে চলচ্চিত্র। দৈনন্দিন জীবনের নানা বাস্তবতায় মানুষ নিজেকে নিয়ে ভাবার ফুসরত হারাচ্ছে, অন্যের জীবনের বিচিত্র সংঘাত ও জীবনাচরণ নিজেরদের এতটাই ব্যস্ত রেখেছে যে নিজের দিকে তাকানোর সময়টুকু নেই।

এখন হয়তো অনেকই আগের মত ডুব দেয় না রবীন্দ্রনাথ কিংবা সুনীলে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিনোদন মাধ্যমেরও পরিবর্তন এসেছে, পরিবর্তন এসেছে যুক্তি ও চিন্তায়। অস্থির সময়ে নিজের ভুবনে অবগাহন করা, আত্মানুসন্ধান এখন খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে চলচ্চিত্র পারে ক্যামেরার চোখে নিজের স্বরূপ সন্ধানে সহায়ক হতে। নির্দিষ্ট কিছু কাল্পনিক মুহূর্তে পরিক্রমণ দর্শককে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে পারে নিজের কাছে।

উৎকৃষ্ট মানের চলচ্চিত্রের রয়েছে সেই সম্মোহন শক্তি যেখানে চরিত্র ও দর্শকের দর্শন এক বিন্দুতে মেলে, তখন চরিত্রের জেতা-হারায় দর্শকেরই হার-জিত ঘটে। চলচ্চিত্র জীবন্ত করে তুলে ধরে, সংযোগ স্থাপন করে জীবনের নিগুঢ় সত্য অনুধাবনে। শিল্পের সার্থকটা হয়তো এখানেই কাম্য। চলচ্চিত্র ব্যক্তির জীবন ঘনিষ্ঠ একটা অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্রাভিনেতা সালমান শাহের মৃত্যুর পর অনেক মেয়ে আত্মহনন এর পথ বেছে নেয় এবং ভারতেও “দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে” সিনেমার পর ওই দশকের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভারতীয় যুবকের নাম রাজ রাখা হয়েছিলো এমনকি পোশাক এবং চুল কাটার ধরণে বিশাল পরিবর্তন আসে।

সুতরাং একটি কার্যকর চলচ্চিত্র দর্শকের ব্যক্তি মানস গঠন ও মতাদর্শ বিনির্মাণে সহায়তা করে যা দৈনন্দিন জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলে, তেমনি চলচ্চিত্র বোদ্ধারাও দর্শকের বাস্তবিক আবেগপ্রবণ রসদ সমন্বিত করে পরিপূরক পন্থায় পুনরায় নতুন নতুন চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করেন দর্শকদের। অন্যান্য মাধ্যমের থেকে চলচ্চিত্রের আলাদা শক্তি হল বিশাল ক্যানভাসে এক সাথে সহস্র মানুষের কাছে খুব অল্প সময়ে পৌঁছায়। ব্যক্তির ভেতরকার অপ্রকাশিত কাল্পনিক সত্তা বাস্তবিক পরিভ্রমণ করতে পারে না বলেই সে একটা মাধ্যমের আশ্রয় নেয়। তার সুপ্ত বাসনার প্রতিফলন স্বরূপ অনন্ত জলিল (চলচ্চিত্রাভিনেতা) এর বুক ছিঁড়ে হৃদয় হাতে নেয়া সম্ভব হয়। চলচ্চিত্র যে বিনোদনের মাধ্যমও বটে। তবে নির্মাতাদের দায়িত্ববোধ অনস্বীকার্য। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজের নানা সংস্কার ভেঙ্গে নতুন মত প্রতিষ্ঠা করা যায়; কখনো কখনো তা বৈশ্বিক রূপ লাভ করে; যা সাদরেই দর্শক গ্রহণ কিংবা বর্জন করার অধিকার রাখে। কেননা, দর্শকই এর প্রাণ ভোমরা। আর এভাবেই তা বিনোদনের সাথে সাথে শিক্ষামূলক হয়ে ওঠে। যদিও বাংলা চলচ্চিত্রের মানের উন্নয়ন সময়ের দাবি তথাপি বর্তমান চলচ্চিত্র যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অন্যান্য মাধ্যমের থেকে এর স্থায়িত্ব বেশি।

কখনো পাথর খোদাই, তাম্রলিপি, শিলালিপিসহ নানা অনুষঙ্গে আদিকাল থেকেই মানুষ তাঁর সভ্যতার পদচিহ্ন রেখে যাওয়ার প্রচেষ্টা করেছেন। পূর্বকাল থেকে বর্তমান সময়েও চলচ্চিত্র তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ/দলিল হয়ে ওঠে। কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সমাজ, সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর জীবন ব্যবস্থাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত হতে পারে। সুতরাং নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, মানবীয় গুণাবলিকে উজ্জীবিত করতে এবং নান্দনিক মননের বিকাশে চলচ্চিত্র দেখার যে প্রয়োজন আছে তা সহজেই অনুমেয়।

এছাড়া বৈশ্বিক চলচ্চিত্রের যে উদীয়মান পরিস্থিতি তা খুব সহজে অনুধাবন করা যায়, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশও প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্রবিদ্যা নিয়ে বেশ চর্চা ও প্রয়োগ শুরু হয়েছে, যার দরুণ বিশ্ব চলচ্চিত্রে আমাদের বেশ কিছু সফলতাও এসেছে। তাই নিজেকে উজ্জীবিত করার জন্য, সফল হতে হলে হয়তো “পারসুইট অফ হ্যাপিনেস” এর মত চলচ্চিত্র আজও দর্শকের জীবনে অনুপ্রেরণার বিশেষ কারণ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: লাবনী আকতার, চলচ্চিত্রবিষয়ক এম. ফিল গবেষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Spread the love

1 thought on “আমরা চলচ্চিত্র কেন দেখবো? কেন দেখবো না!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *